একসময় যে মাঠজুড়ে ছিল সবুজের সমারোহ, সেখানে এখন গড়ে উঠছে কলকারখানা, বসতবাড়ি আর পাকা সড়ক। এই চিত্র ময়মনসিংহের। দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের চাপে গত এক দশকে জেলায় কমেছে ২০ হাজার ৪১৪ হেক্টর কৃষিজমি। সবচেয়ে বেশি কৃষিজমি হারিয়েছে শিল্পনগরী ভালুকা। কৃষিজমি কমে যাওয়ায় খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের জীবিকা ও পরিবেশ নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
কৃষি বিভাগের তথ্য, জেলায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩১ হাজার ৮২৩ হেক্টর। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আবাদি জমি কমেছে ৬৪৯ হেক্টর, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১ হাজার ৪১৬ হেক্টর, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১ হাজার ৪২৫ হেক্টর, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৩২ হেক্টর, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৯৮ হেক্টর, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ২৩ হেক্টর, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ হাজার ৬২৮ হেক্টর, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৭১ হেক্টর এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমেছে ৪ হাজার ৫৭২ হেক্টর আবাদি জমি। আর ভালুকায় ২০২১ থেকে ২০২৬ এই ছয় বছরে কমেছে ৪ হাজার ৬০৭ হেক্টর। ২০২০ সালে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ৮৬৯ হেক্টর।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভালুকা শহর লাগোয়া ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশের বাঘসাতরা এলাকায় ৬৫ বিঘা জলাশয় বালু ফেলে করা হচ্ছে ভরাট। কয়েক মাসের মধ্যে এখানে গড়ে তোলা হবে বিশাল কারখানা। যেখানে কয়েক বছর আগেও উৎপাদন করা হতো ধান।
স্থানীয় চা-দোকানি জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমার বেড়ে ওঠা এই এলাকাতেই। এখন যে জায়গাটি বালু ফেলে ভরাট করা হচ্ছে, সেখানে ১০ বছর আগেও ধান হয়েছে। এরপর করা হয়েছে মাছ চাষ। তবে ধানি জমি কমলেও কারখানা হওয়ায় এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে, এটা মানতে হবে।’
ইনোফলো বিডি কোম্পানির সিকিউরিটি ইনচার্জ সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘কয়েক দিন হলো ইনচার্জ হিসেবে যোগদান করেছি। এখানে এখন শুধু বালু ভরাট করা হচ্ছে। পরিত্যক্ত জলাশয় ভরাট করতে অনেক বালু লাগছে। পরে এখানে কী কোম্পানি হবে সেটা আমার জানা নেই।’
ভরাডোবায় চলমান রয়েছে নাসির ফুটওয়্যার কোম্পানির কাজ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা কোম্পানির জায়গায় একসময় ধান, পাট, মাছ চাষ এবং গরুর খামার ছিল। জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে করা হয়েছে কোম্পানি।
স্থানীয় তাজউদ্দিন বলেন, ‘২০০ একর জমির ওপর নাসির ফুটওয়্যার কোম্পানি। আমার ১ একর ৭০ শতাংশ জমি কোম্পানিকে দিয়েছি স্থানীয় একজনের মাধ্যম হয়ে। কিন্তু এখনো পুরো টাকা পাইনি। বলছে দেবে, কিন্তু কবে পাব তা বুঝতে পারছি না।’
ভালুকা উপজেলা কৃষি অফিসার নুসরাত জামান বলেন, ‘প্রতিনিয়ত ভালুকায় কলকারখানা হচ্ছে। এতে করে কমছে কৃষিজমি। অনেক সময় চাপে পড়ে কৃষিজমি অকৃষি দেখিয়ে আমাদের প্রত্যয়ন দিতে হচ্ছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এনামুল হক বলেন, জেলার কোনো জমিকেই অকৃষি জমি বলা যাবে না। এসব জমিকে কোনো না কোনো ফসল কিংবা মাছ চাষ হয়ে থাকে। জমি রক্ষায় আইনও মানা হচ্ছে না। প্রতিনিয়ত কমছে কৃষিজমির পরিমাণ।
একের পর এক শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় কৃষিজমি কমার পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ভালুকা শাখার সদস্যসচিব কামরুল হাসান পাঠান কামাল বলেন, পরিকল্পনাহীন শিল্পায়ন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কৃষিজমির সংকট আরও তীব্র হবে।