বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) চার আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। গত শনিবার রাত থেকে গতকাল রোববার রাত পর্যন্ত পৃথক দুই ঘটনায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী, আশরাফুল হক ও শহীদ শামসুল হক—এই চার আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে হামলা, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
আজ সোমবার বিকেলে বাকৃবির ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল হক বলেন, ‘সংঘর্ষের ঘটনা তদন্ত সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে আমরা ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কমিটিগুলো ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্ত করবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে-ই হোক না কেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি এবং আহতদের চিকিৎসাসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে আমরা ইতিমধ্যে একটি সভা শেষ করেছি এবং আশা করছি, খুব দ্রুতই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
মো. শহীদুল হক আরও বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী হল ও আশরাফুল হক হলের মধ্যকার ঘটনায় একটি এবং শামসুল হক হল ও আশরাফুল হক হলের মধ্যকার ঘটনায় আরেকটি কমিটি কাজ করবে। এই দুই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে বিষয়েও আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছি। আশা করছি, আজকের মধ্যেই এর দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।’
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমে গত শনিবার রাত সাড়ে ৯টায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল ও মাওলানা ভাসানী হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এরপর প্রক্টরিয়াল টিমের উপস্থিতিতে রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিষয়টি মীমাংসা হয়। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরই রাত ১২টার সময় বাকৃবির ফসিলের মোড় এলাকায় এক চায়ের দোকান থেকে আশরাফুল হক হল ও শামসুল হক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের শুরু হয়।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল সূত্রে জানা যায়, গতকাল রোববার রাতে আব্দুল জব্বার মোড় এলাকায় সোহরাওয়ার্দী হলের এক শিক্ষার্থীকে একা পেয়ে মাওলানা ভাসানী হলের ৮ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি জব্বার মোড় দিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজন আমাকে পেছন থেকে টেনে ধরে। আমি জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছে? তখন তারা আমাকে উসকানিমূলক কথা বলতে শুরু করে। এরপর তারা আমাকে মারধর করে। তারা এমনভাবে মারছিল যে, আমি ভেবেছিলাম, হয়তো বাঁচব না। কোনো রকমে সেখান থেকে পালিয়ে প্রাণে বাঁচি। তারা আমার চশমা ভেঙে ফেলে এবং মানিব্যাগও নিয়ে যায়। এর আগে একটি হোটেলে খাবারের সময় হামলাকারীদের কয়েকজনকে আমাকে শনাক্ত করতে দেখেছি।’
ঘটনার পরপরই সোহরাওয়ার্দী হলের শিক্ষার্থীরা বিচারের দাবিতে একত্র হন। হলের জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী মিজু আহমদ বলেন, ‘আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। আগের দিনের ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় আজ আবার এমন হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রশাসন যদি এখনই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করে, তাহলে ভবিষ্যতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অস্থিতিশীল থাকবে। আমরা চাই, প্রশাসন দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক।’
এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘ওরা যা করছে, সেটি অন্যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত এটার যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। গতকাল রাতে যা হয়েছে, এই মারামারিতে উভয় পক্ষেরই দায় আছে।’
অন্যদিকে একই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসিল মোড় এলাকায় শামসুল হক হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী আশরাফুল হক হলের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় চায়ের দোকানে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। পরে দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। উভয় পক্ষের শিক্ষার্থীরা অন্য হলের গেট ও আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালিয়েছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আশরাফুল হক হলের ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা ব্যাচমেট ও জুনিয়রসহ সাতজন শিক্ষার্থী ফসিলের মোড় এলাকায় চায়ের দোকানে বসে থাকাকালে শামসুল হক হলের প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী অতর্কিত হামলা চালিয়ে গ্লাস, কাপ ও বেঞ্চ দিয়ে মারধর করে। হামলাকারীরা আমাদের গালাগাল করে শামসুল হক হলের দিকে নিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করে।’
অন্যদিকে শামসুল হক হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, পূর্ববর্তী বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যেই উত্তেজনা তৈরি হয় এবং ফসিল মোড় এলাকায় হাতাহাতির পর ভুল তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে আশরাফুল হক হলের শিক্ষার্থীরা শামসুল হক হলের গেটে গিয়ে ভাঙচুর চালান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীম বলেন, আজ উপাচার্যের নেতৃত্বে প্রভোস্ট কাউন্সিল, প্রক্টরিয়াল বডি ও অ্যাডভাইজরি বডির সদস্যদের নিয়ে সাম্প্রতিক ধারাবাহিক সংঘর্ষের ঘটনাগুলো নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
মো. আব্দুল আলীম আরও বলেন, ‘বিভিন্ন হল থেকে পাওয়া কাগজপত্র, আমাদের পর্যবেক্ষণ এবং ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে যারা দোষী প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন ও অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ বিষয়ে সুস্পষ্ট অর্ডিন্যান্স রয়েছে এবং সেই অর্ডিন্যান্স অনুসারেই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রসঙ্গত, এক সপ্তাহ আগেও প্রথম বর্ষের দুই শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে আশরাফুল হক হল ও শামসুল হক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় অন্তত ১৩ জন শিক্ষার্থী আহত হন। আবার গত শনিবার রাতে অনলাইনে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটিকে কেন্দ্র করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানী হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েক দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় চারজন শিক্ষার্থী আহত হন। এক সপ্তাহের ব্যবধানে চারটি আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।