হোম > সারা দেশ > ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহ অঞ্চল

ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল-লাইনচ্যুতি যেন নিয়মিত ঘটনা

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

সম্প্রতি গফরগাঁওয়ে লাইনচ্যুত ট্রেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

একসময়ের নির্ভরযোগ্য ও স্বস্তির রেলযাত্রা এখন যেন আতঙ্কের নাম। পুরোনো রেললাইন, জরাজীর্ণ ইঞ্জিন আর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনা ও ভোগান্তির শঙ্কা। দেশের ব্যস্ততম রেলপথগুলোর একটি ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা, জামালপুর, মোহনগঞ্জ, জারিয়া, কিশোরগঞ্জ ও চট্টগ্রাম রুট। ৭০ বছর বা তারও বেশি পুরোনো এসব লাইনে গত প্রায় তিন মাসে পাঁচটি ট্রেন লাইনচ্যুত ও ২২টি ট্রেনে যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা ঘটেছে।

যান্ত্রিক ত্রুটি বা লাইনচ্যুতির ঘটনায় যাত্রীকে সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। অথবা বিকল্প পথে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয় তাঁদের। ময়মনসিংহ অঞ্চলের ট্রেনযাত্রায় দুর্ঘটনা, ইঞ্জিন বিকল ও লাইনচ্যুতি যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। জানা গেছে, গত প্রায় তিন মাসে পাঁচটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে। একই সময়ে ইঞ্জিন বিকল, আগুন, সংযোগ বিচ্ছিন্ন, লাইনচ্যুতিসহ অন্তত ২২টি বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা ঘটেছে। এতে লাখো যাত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

সর্বশেষ গত শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টার দিকে জামালপুর থেকে ঢাকাগামী তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনটি ময়মনসিংহ নগরীর নতুন বাজার এলাকায় ইঞ্জিন বিকল হয়ে থেমে যায়। এতে জামালপুর-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল আধা ঘণ্টা বন্ধ ছিল। পরে বিকল্প ইঞ্জিনে তিস্তা এক্সপ্রেস ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনে নেওয়া হলে ওই রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আক্তার হোসেন বলেন, ট্রেনের ইঞ্জিন দুর্বল হয়ে পড়েছে। যে কারণে সামান্য ত্রুটিতেই জামালপুর থেকে ঢাকাগামী তিস্তা এক্সপ্রেস ময়মনসিংহ নগরীর নতুন বাজার এলাকায় দাঁড়িয়ে যায়। পরে বিকল্প ইঞ্জিনে তিস্তা এক্সপ্রেস ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনে আনা হলে ওই রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। ট্রেন লাইনচ্যুত, ইঞ্জিন বিকল ও ইঞ্জিনে আগুন এখন নিয়মিত ঘটনা বলেও জানান তিনি।

এর আগে ২২ আগস্ট ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে একটি কমিউটার ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা আটকে ছিল। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার ট্রেনটি সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটের দিকে গফরগাঁও রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছালে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। পরে ট্রেনের চালক, পরিচালক ও রেলওয়ের কর্মীরা ইঞ্জিন মেরামত করেন। এরপর সকাল ১০টা ৪৮ মিনিটে ট্রেনটি পুনরায় চলাচল শুরু করে।

১৫ আগস্ট বেলা আড়াইটার দিকে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায় অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটে। তবে এক নম্বর লাইন দিয়ে ঢাকার সঙ্গে ময়মনসিংহের ট্রেন চলাচল চালু ছিল।

৭ আগস্ট গফরগাঁও স্টেশনের অদূরে জামালপুর কমিউটার ট্রেনের পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে সাত ঘণ্টা ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। এর আগে গত ১৬ জুলাই তিন ঘণ্টার ব্যবধানে একই রুটে দুটি ট্রেনের লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটে। গত ১০ জুন ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ রেলক্রসিং এলাকায় ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেসের পাওয়ার কার লাইনচ্যুত হলে উদ্ধারকারী ট্রেনও লাইনচ্যুত হয়।

রেলওয়ের তথ্যানুযায়ী, গত এপ্রিলে ছয়টি, মে মাসে আটটি ও জুন মাসে তিনটি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়। গত ১৫ জুন গফরগাঁওয়ে জামালপুর এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন ও বগির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই দিন আঠারোবাড়িতে বিজয় এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনে আগুন লাগে এবং পরে বিকল্প ইঞ্জিনও বিকল হয়। এর আগে গত ১৩ জুনে ময়মনসিংহ স্টেশনে তিস্তা এক্সপ্রেসের এসি কোচে আগুন লাগে।

এই রুটে বর্তমানে ১৮ জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও ইঞ্জিন ও কোচ-সংকটে কয়েকটি মেইল ও লোকাল ট্রেন বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি অসংখ্য অবৈধ ও অরক্ষিত রেলক্রসিং, গেটম্যান-সংকট ও দুর্বল সিগন্যাল ব্যবস্থাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

রেললাইন ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথের বিভিন্ন স্থানে রেললাইনকে স্লিপারের সঙ্গে সংযুক্ত রাখার ফাস্টেনিং ক্লিপ ভাঙা বা অনুপস্থিত। কোথাও ক্ষয়প্রাপ্ত স্লিপার, দুর্বল বেস প্লেট ও সংযোগস্থল চোখে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ত্রুটি দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলে ট্র্যাকের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে লাইনচ্যুতির ঝুঁকি বাড়বে। পাশাপাশি পুরোনো ট্র্যাক, দুর্বল ব্যালাস্ট, বসে যাওয়া লাইন ও সেতুর দুই পাশের মাটি ধসের ঘটনাও উদ্বেগজনক।

যাত্রীদের দাবি, আশ্বাস নয়, ঝুঁকিপূর্ণ ট্র্যাক সংস্কার, ভাঙা ফাস্টেনিং ক্লিপ ও স্লিপার প্রতিস্থাপন, নতুন ইঞ্জিন সংযোজন, আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ রেলপথকে নিরাপদ করা হোক। অন্যথায় বড় দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হবে। একের পর এক দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও কার্যকর পরিবর্তন না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়েও।

ময়মনসিংহ লোকোশেডের পরিদর্শক শফিউল হাসান জানান, অনেক পুরোনো ইঞ্জিন পূর্ণাঙ্গ মেরামতের আগেই চলাচলে নামাতে হচ্ছে। ফলে বিকলের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান বলেন, রুটটিতে অধিকাংশ ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ। নতুন ইঞ্জিন সংযোজনের পাশাপাশি শ্রীপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে বিদ্যাগঞ্জ, গৌরীপুর, আঠারোবাড়ি, মোহনগঞ্জ ও জারিয়া পর্যন্ত রেলপথ সংস্কার জরুরি। পাথরের ঘাটতির কারণে ট্র্যাক দুর্বল হয়ে পড়ছে।