দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লাখ লাখ মানুষ বছরের পর বছর সব ধরনের নাগরিক অধিকারের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু আজও তাদের সেসব দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে আবারও সব ধরনের নাগরিক অধিকারের দাবি জানিয়েছে মৌলভীবাজারের এসব মানুষ।
বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরাম সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে পাহাড় ও সমতলে ৫০টির বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায় শত শত বছর ধরে বসবাস করছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজারে মণিপুরী, খাসিয়া, ত্রিপুরা, গারো, ওঁরাওসহ ২৫টির বেশি সম্প্রদায়ের প্রায় ২ লাখ মানুষের বাস। নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে বসবাস করলেও সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত তারা। বিশেষ করে ভূমির অধিকার নেই। নেই শিক্ষার জন্য সরকারি বিদ্যালয়। চিকিৎসাব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানি ও যোগাযোগব্যবস্থা খুবই নাজুক। ভূমির অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পাহাড় ও টিলায় ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। তাই তারা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বা উপজাতি নয়, আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি এবং ভূমিসহ সব ধরনের নাগরিক অধিকারের দাবি জানায়।
সিলেট আদিবাসী ফোরামের নেতারা বলেন, ‘জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করা হয়। আমাদের দেশে দিবসটি বেসরকারিভাবে আমরা পালন করি। তবে সরকারিভাবে আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আদিবাসীরা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বেঁচে আছে। তারা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’
চা-শ্রমিক সন্তান দিনেশ বাউরি বলেন, ‘এই সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম চা জনগোষ্ঠী। চা-বাগানে বহু আদিবাসী কাজ করেন। তবে তাঁরা সবকিছু থেকে বঞ্চিত। কাগজে-কলমে বাংলাদেশি নাগরিক হলেও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে ভূমির অধিকার ও মজুরি বৃদ্ধির জন্য দাবি জানালেও তা বাস্তবায়ন হয় না। কর্মসংস্থানের অভাবে হাজার হাজার চা-শ্রমিক বেকারত্ব নিয়ে ঘুরছেন।’
খাসিয়া সম্প্রদায়ের সাজু মারচিয়াং বলেন, ‘তারা বরাবরের মতো সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শত বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করলেও এখনো ভূমির অধিকার নিশ্চিত হয়নি। অনেক পুঞ্জিতে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। শিক্ষার জন্য নেই কোনো সরকারি ব্যবস্থা। পাহাড়ে পান চাষ করে বেশির ভাগ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছে। খাসিয়াপাড়াগুলোতে বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, ‘আদিবাসীরা যেহেতু দেশের নাগরিক, তাদের অবশ্যই ভূমির অধিকার দেওয়া প্রয়োজন। শুধু ভূমি নয়, তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন মনে করি। কারণ শত শত বছর ধরে তারা বসবাস করেছে অথচ তাদের আদিবাসী হিসেবে এখনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।’
বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, ‘আদিবাসীরা শিক্ষা, চিকিৎসা, ভূমির অধিকার ও মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে চা-শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বৃদ্ধি করতে হবে। শত বছর ধরে বসবাস করলেও এখনো ভূমির অধিকার পায়নি শ্রমিকেরা। চা-শ্রমিকসহ সব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নাগরিককে আদিবাসী হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দিতে হবে।’
বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের কো-চেয়ারপারসন ও মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির হেডম্যান জিডিসন প্রধান সুচিয়াং বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আদিবাসীদের ভূমির অধিকার এখনো নিশ্চিত হয়নি। আমাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলা হয়। বর্তমান সরকারের কাছে আমরা দাবি জানাচ্ছি, আমাদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক ও সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হোক।’
মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেন বলেন, ‘আদিবাসীরা আমাদের কাছে কোনো দাবি জানায়নি। তারা যদি আমাদের কাছে কোনো দাবি জানায়, তাহলে তাদের দাবি সরকারের কাছে পৌঁছে দেব।’