দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫০ বছরের বেশি সময় আগে পণ্য পরিবহনের জন্য সিলেট-আখাউড়া রেলপথ স্থাপন করা হয়। সেই থেকে শত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো রেলপথে লাগেনি কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া। ব্রিটিশরা যেভাবে রেলপথ তৈরি করে ছিল ঠিক একই পথে এখনো ধুঁকে ধুঁকে চলছে ট্রেন। সময় যত যাচ্ছে এই রেলপথ হচ্ছে ততই ঝুঁকিপূর্ণ। গত ৩০ বছর ধরে এ অঞ্চলের মানুষ সিলেট-আখাউড়া রেলপথ ডাবল লাইন করার দাবি জানিয়ে আসছে। এত বছর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া না হলেও সম্প্রতি সরকার এই রেলপথ ডুয়েলগেজ করার পরিকল্পনা করছে। তবে এ অঞ্চলের মানুষ রেলপথটি ডাবল লাইন করার দাবিতে অনড়।
জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯১২ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত সিলেট-আখাউড়া রেলপথ নির্মাণ করে পণ্য পরিবহনের চিন্তা করে। তবে একটা সময় বাণিজ্যের পাশাপাশি ট্রেনের যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিলেট অঞ্চলে মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থায় ট্রেনযাত্রা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। তবে শত বছর পেরিয়ে গেলেও এখানকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেলপথে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও এই অঞ্চলের মানুষেরা তা থেকে বঞ্চিত। এলাকাবাসী এই রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসলেও, বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জনবল ও ইঞ্জিন সংকটের কারণ দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে একের পর এক লোকাল ট্রেন ও স্টেশন। প্রকৃত রেলসেবা থেকে প্রতিদিন বঞ্চিত হচ্ছেন লাখো মানুষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, সিলেট-আখাউড়া ২৩৯ কিলোমিটার রেললাইন ব্রিটিশ আমলের তৈরি। ট্রেন চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলেও বেশির ভাগ জায়গায় রেললাইনের নাট-বল্টু, ফিশপ্লেট ও ক্লিপসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নেই। এগুলো আবার মাঝেমধ্যে চুরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অনেক জায়গায় বল্টুর বদলে সুতো দিয়ে বাঁধা হয়েছে। শত বছরের পুরোনো সেতুগুলো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। এতে লাইন দুর্বল হয়ে বড় ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একটি মাত্র লাইন হওয়ায় রেল ক্রসিংয়ের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। ট্রেনের ইঞ্জিন ও লাইন দুর্বল হওয়ায় পাহাড়ি এলাকায় চলতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এই অঞ্চলের সাধারণ যাত্রীদের একটাই দাবি, সিলেট-আখাউড়া রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, সিলেট-আখাউড়া রেলপথে ডাবল লাইনের পরিবর্তে এখন ডুয়েলগেজে রূপান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন হলে এই পথে একসঙ্গে দুটি ট্রেন চলতে পারবে। বিশেষ করে লাইন ডুয়েলগেজ হলে নতুন যেসব ট্রেন যুক্ত হবে, তা দ্রুত গতিতে চলতে পারবে। ডুয়েলগেজ প্রকল্পের জন্য চায়নার সঙ্গে ইতিমধ্যে কথা হয়েছে।
ঢাকা-সিলেট রেলপথের ট্রেন যাত্রীরা জানান, আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত বেশির ভাগ রেলপথ দুর্বল। প্রতিবছর অনেকগুলো দুর্ঘটনা ঘটে। ব্রিটিশ আমলের তৈরি রেললাইনে টুকটাক সংস্কার করা হলেও বড় ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এখনো। এই পথে ট্রেন যাত্রা নিরবচ্ছিন্ন করতে হলে ডাবল লাইন ছাড়া আর কোনো পথ নেই। শুনেছি লাইন ব্রডগেজ করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে আমরা চাই ডাবল লাইন করার উদ্যোগ নেওয়া হোক। এতে করে এই অঞ্চলের সমস্যা চিরস্থায়ী সমাধান হবে। এখন সিলেট থেকে ঢাকা যেতে প্রায় আট ঘণ্টা লাগে। ডাবল লাইন হলে তখন এর অর্ধেক সময় লাগবে।
শমশেরনগর স্টেশনের বাসিন্দা গিলমান আহমেদ বলেন, ব্যবসায়িক কাজে আমরা নিয়মিত ঢাকায় যাতায়াত করি। তবে ট্রেনের দুর্ভোগের কারণে অনেক ব্যবসায়ী এখন বাসে যাতায়াত করেন। কারণ বেশির ভাগ ট্রেন পাহাড়ি এলাকায় চলতে পারে না। রেল ক্রসিংয়ের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কোনো কারণে ছোট দুর্ঘটনা হলেও একসঙ্গে অনেকগুলো ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় হয়। এসব সমস্যা সমাধানের একটি মাত্র রাস্তা আর তা হলো সিলেট আখাউড়া রেলপথকে ডাবল লাইনে উন্নীত করা।
এই পথের নিয়মিত ট্রেন যাত্রী ও সচেতন নাগরিক মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকা সিলেট রেলপথের আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ডাবল লাইন করা খুবই জরুরি। এই লাইন ডুয়েলগেজ বা ব্রডগেজ হলে পুরোপুরি সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথে আগের মতোই ঝুঁকি থেকে যাবে। ক্রসিং সমস্যাও থেকেই যাবে। লাইন ব্রডগেজ হলে ট্রেনের গতি বাড়ানো হবে, তবে পুরোনো সমস্যা থেকেই যাবে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলের মানুষের দাবি সিলেট-আখাউড়া রেলপথ ডাবল লাইন করার।
কুলাউড়া রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার রুমান আহমেদ ও শমশেরনগর স্টেশনমাস্টার রজত কুমার রায় বলেন, ডাবল লাইন হবে কিনা তা আমাদের জানা নেই। তবে আমরা শুনেছি আখাউড়া সিলেট রেলপথকে ব্রডগেজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে একসঙ্গে নতুন ও পুরোনো দুটি ট্রেন চলতে পারবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, সরকারিভাবে ইতিমধ্যে সিলেট আখাউড়া রেললাইনকে মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে চীনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এই লাইন ডুয়েলগেজ হলে নতুন ট্রেন সংযোজন করা হবে। এতে করে এ লাইনে ভিন্ন মাপের দুটি ট্রেন একসঙ্গে চলতে পারবে।