মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী শকুনি লেক রক্ষায় মানববন্ধন করেছেন বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সচেতন নাগরিকেরা। লেকের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পানিদূষণ রোধ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে শকুনি লেকের পাড়ে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচি শেষে একই দাবিতে মাদারীপুর জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন অংশগ্রহণকারীরা।
মানববন্ধনে অংশ নেন মাদারীপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হাবিবুর রহমান, চিকিৎসক গোলাম সারোয়ার, সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি খান মোহাম্মদ শহীদ, এনায়েত হোসেন নান্নু, অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান পারভেজ, বায়জিদ মিয়াসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। এতে ১০টি সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, শকুনি লেক মাদারীপুর শহরের ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের অন্যতম প্রতীক। একসময় লেকের মনোরম পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন ভিড় করতেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা। কিন্তু নানা অব্যবস্থাপনা, পরিবেশদূষণ ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে লেকটির পরিবেশ ও সৌন্দর্য হুমকির মুখে পড়েছে। দিন দিন দূষিত হচ্ছে লেকের পানি।
বক্তারা আরও বলেন, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাই লেকের পাড়ে থাকা অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে উচ্ছেদ, পানিদূষণ বন্ধ এবং লেকের পরিবেশ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া জাহিদ হাসান বলেন, ‘শকুনি লেক রক্ষায় শুধু সাময়িক উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন, পৌর কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট দপ্তর, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’
অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান পারভেজ বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে শকুনি লেকের ঐতিহ্য ও পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য লেকটিকে পরিচ্ছন্ন, দূষণমুক্ত ও নান্দনিক স্থানে পরিণত করা যাবে।’
মানববন্ধন শেষে জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে লেকের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পানিদূষণ রোধ এবং পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, মাদারীপুর শহরকে নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে সরিয়ে নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় মাটির জোগান দিতে শকুনি লেক খনন করা হয়েছিল। ১৯৩৭-৩৮ সালের দিকে পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনে পুরোনো শহরের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লে নতুন এলাকায় শহরের বিভিন্ন স্থাপনা স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪২-৪৩ সালে লেকটি খনন করা হয় বলে জানা যায়।
সে সময় নতুন এলাকায় আদালত, অফিস-আদালত, হাসপাতাল, থানা, কারাগার ও সরকারি কর্মকর্তাদের বাংলো নির্মাণের জন্য প্রচুর মাটির প্রয়োজন ছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের মাদারীপুর মহকুমা প্রশাসন লেকটি খননের মাধ্যমে সেই মাটির চাহিদা পূরণ করে।
পরবর্তী সময়ে শকুনি লেক মাদারীপুরবাসীর বিনোদন ও সৌন্দর্য উপভোগের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘মাদারীপুরের প্রাণ’ হিসেবে পরিচিত। ২০১৭ সালে মাদারীপুর পৌরসভার তত্ত্বাবধানে প্রায় সাড়ে ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে লেকটির সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়। বর্তমানে প্রতিদিন সকাল-বিকেল স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরাও লেকের পাড়ে সময় কাটাতে আসেন।