লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার দক্ষিণ জগবন্ধু এলাকায় মেঘনা নদীতে জেগে উঠেছে বড় একটি চর। চরের উর্বর মাটিতে গজিয়েছে সবুজ ঘাস। সেই চর দেখে আবার নিজেদের হারানো জমি ফিরে পাওয়ার আশা করছেন একসময়ের নদীভাঙনের শিকার কৃষকেরা। তবে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী অতীতের মতো নতুন চরটিও দখল করে নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
বছরের পর বছর মেঘনার গ্রাসে ভিটেমাটি ও কৃষিজমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে কমলনগরের হাজারো মানুষ। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া সেসব এলাকার কিছু অংশে আবার জেগেছে নতুন চর।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার কটোরিয়া ও কাঁকড়ার চর এলাকায় ৫ বছর আগে জেগে ওঠা প্রায় ৬০০ একর চর স্থানীয় প্রভাবশালী ‘মাতব্বর’ গোষ্ঠীর দখলে রয়েছে। সম্প্রতি চরটি ভোলার চরফ্যাশনের বাসিন্দা সকেট জামালের কাছে এক বছরের জন্য ৩৪ লাখ টাকায় ‘ইজারা’ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। দক্ষিণ জগবন্ধু সীমানায় ৩ বছর ধরে জেগে ওঠা নতুন চরটিও ওই গোষ্ঠী দখল করে নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকেরা। তাঁদের দাবি, নতুন চরে মাতব্বর গোষ্ঠীর কোনো বৈধ মালিকানা নেই। তারপরও তারা চরটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সাল থেকে ক্রমাগত ভাঙনে কমলনগর উপজেলার প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা মেঘনায় বিলীন হয়ে গেছে। ২০১৩-১৪ সালের দিকে চর কালকিনি ও সাহেবেরহাট ইউনিয়নের বড় একটি অংশ নদীতে চলে যায়। একইভাবে চর ফলকন, পাটওয়ারীর হাট ও চর লরেন্স ইউনিয়নেরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়। মেঘনায় ভিটেমাটি ও ফসলি জমি হারিয়ে বহু মানুষ অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। এখন নতুন চর জেগে ওঠায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক ভূমিমালিক আশার আলো দেখছেন।
জমি ফিরে পেতে এবং কথিত জবরদখল ঠেকাতে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকেরা ‘চর জগবন্ধু, ফলকন ও পাটওয়ারীর হাট ভূমিমালিক ঐক্য পরিষদ’ গঠন করেছেন।
দক্ষিণ জগবন্ধু ভূমিমালিক সমিতির সভাপতি জহির উদ্দিন রিয়াজ বলেন, ‘সাহেবেরহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ জগবন্ধুর নিজস্ব সীমানায় নতুন এই চর জেগে উঠেছে। এতে মাতব্বরদের কোনো জমি নেই। প্রকৃত ভূমিমালিকেরা যেন শান্তিপূর্ণভাবে চাষাবাদ করতে পারেন, আমরা সেই চেষ্টা করছি।’
পাটওয়ারীর হাট ইউনিয়নের ভূমিমালিক সমিতির নেতা জাহাঙ্গীর মেম্বার বলেন, ‘ভাঙনের শিকার জগবন্ধু, ফলকন ও পাটওয়ারীর হাটের ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছি। কিন্তু একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী জমিগুলো জোরপূর্বক ভোগদখলের চেষ্টা করছে বলে আমরা জানতে পারছি।’
সাহেবেরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদ বলেছে, আগে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মাতব্বরেরা একটি চর দখল করে সুবিধা নিয়েছে। এখন প্রকৃত ভূমিমালিকদের বঞ্চিত করে দক্ষিণ জগবন্ধুর নতুন চরটিও দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাতব্বর বংশের পক্ষে খোকন মাতব্বর। তিনি বলেন, ‘এককভাবে যে চরটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেটি আমাদের পূর্বপুরুষ ও আত্মীয়স্বজনের চাষাবাদের জমি। নতুন করে জেগে ওঠা চরটিতে আমাদের বসতবাড়ি ছিল। তাই ওই চরে আমাদের দাবি থাকাটা স্বাভাবিক।’ ৩৪ লাখ টাকায় চর ইজারা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে খোকন মাতব্বর বলেন, ‘সেখানে অন্য কারও জমি নেই। তাই সেখানে আমরা যা করি, তা আমাদের নিজস্ব বিষয়।’
কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাহাত উজ জামান বলেন, চর পুরোপুরি জেগে উঠলে জরিপ পরিচালনা করা হবে। এরপর বিধি অনুযায়ী তা বন্দোবস্ত দেওয়া হবে। এর আগে চরের ওপর কারও মালিকানা দাবি করার সুযোগ নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।