বাড়ি থেকে একের পর এক বিষধর সাপ উদ্ধার, সে সঙ্গে ঘুমের ঘোরে বারবার সাপের স্বপ্ন—সব মিলিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটছিল পরিবারের। উপায়ান্তর না দেখে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসের ওপর ভরসা রেখে প্রায় দেড় বছর আগে মানত করেছিলেন—বাড়িতে ‘পদ্মাপুরাণ’ গানের আসর বসাবেন। বিশ্বাস ছিল, এতে কাটবে সাপের উপদ্রব, মিলবে মানসিক শান্তি।
সেই বিশ্বাস থেকে গত শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সন্ধ্যায় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের শালিমপুর গ্রামে প্রয়াত আকরাম হোসেনের বাড়িতে বসেছিল শত বছরের ঐতিহ্যবাহী পদ্মাপুরাণ গানের আসর। আসরকে কেন্দ্র করে গ্রামজুড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ, বাড়ির আঙিনায় বসে কিছু অস্থায়ী দোকানপাটও। সুরের মূর্ছনায় যখন আসর জমে ওঠে, ঠিক তখনই ছন্দপতন ঘটে।
অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণ পরই তারাগুনিয়া এলাকার স্থানীয় এক যুবক শরীফুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি উসকানিমূলক পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘পদ্মা নাচোন (পদ্মাপুরাণ গান) এর বিপক্ষে যারা সাড়া দেন প্লিজ, এখন হচ্ছে শালিমপুর, বন্ধ কোরে দিবো কি?’ পোস্টের পরই ক্ষান্ত হননি তিনি; সরাসরি আসরে গিয়ে ফেসবুক লাইভ চালু করেন।
লাইভে শিল্পীদের পোশাক, সাজসজ্জা, লিঙ্গ ও ধর্ম নিয়ে একের পর এক আপত্তিকর প্রশ্ন তুলতে থাকেন শরীফুল। আসরে উপস্থিত দর্শকদের প্রতিও ব্যবহার করেন অসম্মানজনক ভাষা। একপর্যায়ে তাঁর বাধার মুখে মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যায় রাতের অনুষ্ঠান। লাইভটিতেও এর সত্যতা মেলে।
এমডি শরিফুল ইসলাম নামের ওই আইডি থেকে হওয়া লাইভটি ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি সবার নজরে আসে। পরে আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সেই লাইভ ভিডিও তাঁর ফেসবুকে আর পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত শরীফুল তারাগুনিয়া এলাকার এখতিয়ার মোল্লার ছেলে ও ফেসবুক ভ্লগার।
আয়োজক ও প্রয়াত আকরাম হোসেনের স্ত্রী মুন্নি খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শোওয়ার ঘরে সাপের উপদ্রব থেকে মুক্তি পেতে বিশ্বাস ও ঐতিহ্য মেনে নিজ বাড়িতে এই আসর বসিয়েছিলাম। কিন্তু সংস্কৃতির নামে ধর্মীয় অবমাননা ও কুসংস্কার ছড়ানোর ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে শরীফুল এসে বাধা দেন। ওর বাধার মুখে রাতের অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে পরদিন শনিবার কোনোমতে আসর শেষ করতে হয়েছে।’
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘আগের মতো পদ্মা নাচ এখন আর হয় না। পুরুষ মানুষকে নারী সাজিয়ে উগ্র অঙ্গভঙ্গি করা হচ্ছিল, যা থেকে অসামাজিক কাজের শঙ্কা তৈরি হয়। একজন মুসলিম হিসেবে আমি এটা মেনে নিতে পারিনি, তাই বাধা দিয়েছি।’
তবে স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা কালু হোসেন বলেন, ‘আমার জন্মের পর থেকেই এলাকায় এই ধরনের গানের আসর বসতে দেখে আসছি। এভাবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে জোর করে শত বছরের একটি ঐতিহ্য বন্ধ করে দেওয়া ঠিক হয়নি।’
এ বিষয়ে ওই গানের আসরের শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
আয়োজকদের কাছ থেকে জিয়ারুল হোসেন নামের এক ব্যক্তির মোবাইল নম্বর পাওয়া গেলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী ও সচেতন মহলের মতে, কোনো আয়োজনে সুনির্দিষ্ট আপত্তি থাকলে তা স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো যেত। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে লাইভ করে লোকসংস্কৃতিতে বাধা দেওয়ার এই প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
কুষ্টিয়া জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল কর্মকর্তা তাইফুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। তার ওপর এমন অযাচিত হস্তক্ষেপ গ্রামীণ সংস্কৃতির অস্তিত্বকেই হুমকিতে ফেলে দেয়। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি দৌলতপুর উপজেলা প্রশাসন খতিয়ে দেখবে, জেলা প্রশাসন ও শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে দৃষ্টি রাখা হবে।’
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তোলা হলেও আমাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে তেমন কোনো উপাদান মেলেনি। এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন যদি সমাজ বা কারও ক্ষতি না করে, তবু সেখানে ব্যক্তিগতভাবে বাধা দেওয়ার কোনো অধিকার কারও নেই। অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে ঘটনার ব্যাখ্যা চাওয়া হবে এবং তদন্তে প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে গত ১১ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ফিলিপনগর ইউনিয়নের একটি দরবারের প্রধানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর এক মাসের কম সময়ের ব্যবধানে ৯ মে মথুরাপুর এলাকার হজরত শাহ রউফ (রহ.) মাজারের খাদেম কামাল হোসেনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে ২০২২ সালের নভেম্বরের শুরুতে উপজেলার লাউবাড়িয়া গ্রামে বাউলদের একটি সাধুসঙ্গেও হামলার ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে অনেকেই আহত হন।