টানা বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। ডুবে গেছে সড়ক ও আবাদি জমি। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় বন্ধ রয়েছে পাঠদান কার্যক্রম।
এদিকে রান্নার জায়গা ও চলাচলের পথ তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন চরাঞ্চলের মানুষ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিষধর সাপের উপদ্রব। ঘরবাড়ি ও বসতভিটার আশপাশে সাপের আনাগোনায় আতঙ্কে দিন কাটছে বানভাসি মানুষের।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাইড্রোলজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় গত এক সপ্তাহে পদ্মা নদীতে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ সেন্টিমিটার করে পানি বেড়েছে। আজ শুক্রবার সকাল ৯টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১৩ দশমিক ০২ মিটার। সেখানে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ৭৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাইড্রোলজি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইলিয়াস হোসেন বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা বৃষ্টির কারণে পদ্মায় পানি দ্রুত বাড়ছে। পানি বৃদ্ধির প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, হঠাৎ পানি বেড়ে যাওয়ায় চরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সড়কগুলো তলিয়ে যাওয়ায় নৌকা, ডিঙি ও ভেলা হয়ে উঠেছে চলাচলের প্রধান মাধ্যম। অনেক পরিবারের রান্নার জায়গা পানিতে তলিয়ে গেছে। দেখা দিয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও খামারিরা।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে গত দুই-তিন দিনে তাঁর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ১৯টি গ্রামের মধ্যে ১৭ টির নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। এতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। স্কুলগুলোতে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। পানি ওঠার পর থেকে বিষধর সাপের উপদ্রবও বেড়েছে। ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন অনেকে।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল বলেন, তাঁর ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামের চারপাশে এখন পানি। সড়কগুলো ডুবে যাওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক বাড়ির ভেতরে পানি না ঢুকলেও বসতভিটা পর্যন্ত পানি উঠে এসেছে। পানির দুর্ভোগের পাশাপাশি সাপের আতঙ্কেও মানুষ দিশেহারা।
এদিকে পদ্মার পানি বৃদ্ধিতে ফিলিপনগর ও মরিচা ইউনিয়নের চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ আবাদি জমিও তলিয়ে গেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত ৭০টি পরিবারের মধ্যে জরুরি ত্রাণ হিসেবে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শুভাগত বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। বানভাসি মানুষের তালিকা তৈরি করে তাঁদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে দুর্গতদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রেখেছি।’
এদিকে দুর্গত এলাকার প্লাবিত মানুষের দাবি, জীবন রক্ষায় অবিলম্বে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ সুনিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বানের পানিতে বিষধর সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় সাপের কামড়ের চিকিৎসায় জরুরি অ্যান্টিভেনম মজুত রাখা এবং ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে উপদ্রুত অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় আরও চরম আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তাঁরা।