কলকাতায় আগুনে প্রাণ হারানো সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের মেয়ে মহিমা দত্তের বয়স মাত্র সাত বছর। মৃত্যু কী, প্রিয় মানুষদের চিরদিনের জন্য হারানোর বেদনা কতটা গভীর—তা বোঝার মতো বয়স এখনো হয়নি তার। তাই হয়তো এখনো বারবার জানতে চায়, মা কোথায়, বাবা কোথায়, ছোট ভাইটি কোথায়। প্রিয় মানুষগুলোকে একবার দেখতে চায়, কাছে যেতে চায়। কিন্তু সেই আবদার পূরণ করার মতো মানুষগুলো যে আর পৃথিবীতে নেই—এই নির্মম সত্যটি কীভাবে বোঝানো হবে ছোট্ট মহিমাকে?
গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল শিখা ইনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বাবা সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, মা আফসানা শারমীন ও ছোট ভাই স্বর্ণশীষ দত্তকে হারায় মহিমা। গত বুধবার দুপুরের দিকে স্বজনদের কাছ থেকে সে মৃত্যুর খবর জানতে পারে।
গত শনিবার সন্ধ্যায় কফিনবন্দী হয়ে দেশে ফেরে মহিমার বাবা, মা, ছোট ভাই ও নানা আকরাম হোসেনের মরদেহ। রাত সাড়ে ১০টার দিকে চারজনের মরদেহ কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসায় পৌঁছালে সেখানে স্বজনদের ভিড় জমে যায়।
লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ি থেকে যখন ছোট ভাই স্বর্ণশীষের কফিন নামানো হয়, তখন হয়তো কিছুটা বুঝতে পারে মহিমা। চোখের পানি আর আটকে রাখতে পারেনি অবুঝ শিশুটি। পরে তাকে দেখানো হয় বাবা ও মায়ের মরদেহও। স্বজনদের কাছে বারবার মা-বাবা ও ভাইকে দেখার আবদার করতে থাকে সে। শেষকৃত্য ও দাফনের আগ পর্যন্ত স্বজনেরা তার সেই আবদার পূরণে চেষ্টা করেছেন। বারবার তাকে নিয়ে গেছেন প্রিয় মানুষগুলোর কাছে। কিন্তু এরপর? এখন যদি মহিমা আবারও তার বাবা-মা ও ছোট ভাইকে দেখতে চায়? তাদের কাছে যেতে চায়? একবার ছুঁয়ে দেখতে চায়? তখন তাকে কী জবাব দেবেন স্বজনেরা? কীভাবে বোঝানো হবে—তার বাবা আর কোনোদিন তাকে কোলে নেবেন না, মা আর কোনোদিন আদর করে ডাকবেন না, ছোট ভাইটি আর কোনোদিন তার সঙ্গে খেলবে না? মহিমা কুষ্টিয়া শহরের এডুকেয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের কেজি শ্রেণির ছাত্রী। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো একদিন সে বুঝবে, কেন তার বাবা-মা ও ভাই আর ফিরে আসেনি। কিন্তু সেই বোঝাপড়ার প্রতিটি ধাপেই প্রিয় মানুষ হারানোর শূন্যতা তাকে তাড়া করবে।
পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পৃথক ধর্মীয় রীতিতে রাতেই শেষকৃত্য ও দাফন সম্পন্ন হয়। সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তাঁর শিশুসন্তান স্বর্ণশীষের মরদেহ কুষ্টিয়া মহাশ্মশানে সনাতন ধর্মীয় রীতিতে শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে সৎকার করা হয়। পরে বাবা ও ছেলেকে পাশাপাশি সমাধি দেওয়া হয়। অন্যদিকে দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমীন ও শ্বশুর আকরাম হোসেনকে রাত ৩টার দিকে কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে মুসলিম ধর্মীয় রীতিতে দাফন করা হয়।
কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আল মামুন সাগর বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, নিহতদের পরিবারগুলোকে দ্রুত ক্ষতিপূরণসহ সরকারি সহায়তা দেওয়া হোক।’
দেবাশীষের বাবা দিলীপ দত্ত কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিজেকে সামলে তিনি বলেন, ‘ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতিকে হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। দেবাশীষের উপার্জনেই আমাদের পরিবার চলত। এখন আমরা একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছি। এই অবস্থায় সরকারের কাছে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানাচ্ছি।’