ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং সন্ধ্যাকালীন পরীক্ষায় অসদুপায় ঠেকানো যাচ্ছে না। নকলের দায়ে গত এক বছরে ৬০ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তবু বন্ধ হচ্ছে না নকল।
পরীক্ষার হলে নকলে কাগজপত্রের পাশাপাশি স্মার্টফোন ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ঘটনাও ঘটছে। তবে নকলের সুযোগ তৈরিতে পরীক্ষাকেন্দ্রে ব্যবহৃত ক্লোজড ফ্রন্ট টেবিলকে দায়ী করছেন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখা গেছে, আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিনিউকেশন টেকনোলজি (আইসিটি), আরবি ভাষা ও সাহিত্য, আইন, ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বাংলা, শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান, গণিত, পরিসংখ্যান, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং জিওগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগে ক্লোজড ফ্রন্ট টেবিল ব্যবহার করা হচ্ছে।
এসব টেবিলের সামনের অংশ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় পরীক্ষার্থীর নিচের অংশ বাইরে থেকে দেখা যায় না। ফলে টেবিলের আড়ালে নকলের কাগজ বা অন্য উপকরণ রাখলে তা দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকের নজর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে। তা ছাড়া শিক্ষকেরা সাধারণত উত্তরপত্র এবং পরীক্ষার্থীর লেখার দিকে বেশি নজর দেন। ফলে টেবিলের নিচের অংশ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয় না।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের ২ জুলাই থেকে চলতি বছরের ২২ জুলাই পর্যন্ত শৃঙ্খলা কমিটির পাঁচটি সভায় অসদুপায়ের দায়ে অন্তত ৬০ শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে গত বছরের ২ জুলাই ৭১তম সভায় ৮ জন, ২১ অক্টোবর ৭২তম সভায় ৭ জন এবং ২ ডিসেম্বর ৭৩তম সভায় ১৩ জন শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া হয়। চলতি বছরের ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত ৭৪তম সভায় ১৫ জন এবং সর্বশেষ ২২ জুলাই অনুষ্ঠিত ৭৫তম সভায় আরও ১৭ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়।
ওয়াশরুমসহ বিভিন্ন গোপন স্থানে নকলের কাগজ রাখা এবং হলে স্মার্টফোন, স্মার্টওয়াচসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের দায়ে তাঁদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী, নকলের ঘটনায় নির্দিষ্ট কোর্সের পরীক্ষা বাতিল, মানোন্নয়ন পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কিংবা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করাসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে।
শিক্ষার্থীরা বলেন, কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নীরব ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগে অভ্যন্তরীণভাবে এসব ঘটনা মীমাংসার চেষ্টার কারণেই নকলের প্রবণতা বাড়ছে। নকল বন্ধ করতে হলে চারদিক থেকে সহজে দেখা যায়—এমন টেবিল ব্যবহার করা উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মুমতাহিনা রিনি বলেন, ‘এসব টেবিলের কারণে শিক্ষার্থীরা খুব সহজে মোবাইল, কাগজসহ নকলের উপকরণ রাখার সুযোগ পান কিন্তু শিক্ষকেরা তা ধরতে পারেন না। এসব টেবিল পরিবর্তন করা উচিত।’
আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী রউফুল্লাহ খান বলেন, ‘এসব টেবিলের কারণে পরীক্ষাকেন্দ্রে নিরাপদে নকল করা যায়। সেমিস্টার পরীক্ষার পাশাপাশি ইনকোর্স, মিডটার্ম ও ক্লাস টেস্টেও নকল হয়। অতিরিক্ত নকল প্রবণতার কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আস্থা হারাচ্ছেন।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুল মালেক মিয়া বলেন, ‘এ বিষয়ে উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলেছি। টেবিলগুলো যদি শিক্ষার্থীদের ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে একটা সিদ্ধান্তে আসব। এ বিষয়ে এখনই কিছু বলতে পারছি না।’
এসব টেবিলের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমানকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি। তবে এর আগে নকল প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘পরীক্ষায় যেকোনো অসদুপায় ঠেকাতে সভাপতি ও ডিনদের সঙ্গে আলোচনা করে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা পরিচালনার নিয়ম পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। পরীক্ষার হলে মোবাইলসহ সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিষিদ্ধ। অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের ৩০ নম্বর সেমিস্টার পরীক্ষার আগে প্রকাশ, সিসিটিভি স্থাপন এবং নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা করা হবে।’