হোম > সারা দেশ > কুড়িগ্রাম

কুড়িগ্রাম: সংকট সামলাতে সারের ব্যবহার কমাতে বলছে কৃষি বিভাগ

আরিফুল ইসলাম রিগান, কুড়িগ্রাম 

প্রতীকী ছবি

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকের সারের আকুতি শেষ হচ্ছে না। আমন, সবজিখেতসহ রবি মৌসুমের আগাম সবজি চাষে চাহিদার বিপরীতে সারের বরাদ্দ অনেক কম বলে জানা গেছে। বিপণন কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়ে চাপ কমানো গেলেও সারের চাহিদা কমানো যায়নি। বেশির ভাগ কেন্দ্র থেকে সার না পেয়ে অনেক কৃষক শূন্য হাতে ফিরে যাচ্ছেন। যাঁরা পাচ্ছেন, তা চাহিদার অর্ধেক কিংবা দুই-তৃতীয়াংশ।

কৃষি বিভাগের দাবি, বিগত বছরের চেয়ে সারের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকদের অতিরিক্ত সার প্রয়োগের প্রবণতা রয়েছে। বেশির ভাগ আমনখেতে আর ইউরিয়া দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমন চারার এই বয়সে ডিএপি সারের প্রয়োজন না থাকলেও কৃষকেরা খেয়ালখুশিমতো সার প্রয়োগ করছেন। এতে চারাগাছ কিছুটা পুষ্ট দেখালেও মাটির অম্লত্ব বাড়ছে, উর্বরতা শক্তি কমে যাচ্ছে। অনেকে রবি মৌসুমকে সামনে রেখে আগাম সার সংগ্রহ করছেন।

তবে কৃষি বিভাগের এই দাবির সঙ্গে কৃষকদের মত ভিন্ন। তাঁদের দাবি, জমিতে সার প্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দিলেও তাঁরা পাচ্ছেন না। পেলেও চাহিদার অনেক কম। সারের অভাবে আগাম সবজি চাষ বিঘ্নিত হচ্ছে। সারপ্রাপ্তিতে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও আছে।

কৃষক আবু বক্কর বলেন, ‘আড়াই বিঘা জমিত ধান। ১৫ দিন ধইরা ঘুরি। ঘুরতে ঘুরতে জান শ্যাষ। বারে বারে একে লোক সার পায়। আমরা ঘুইরাও পাই না। নিয়ম করি দেইক, তাইলে সবাই পায়। সার দেয় মুখ দেইখা।’

আবু বক্কর জানান, গত বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় উপজেলার বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীর মোড়ে নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রে যান তিনি। কিন্তু পাওয়ার আগেই সার শেষ। আবু বক্কর জানান, বিক্রয়কেন্দ্রে যাওয়া অন্তত ২০০ কৃষক সার না পেয়ে ফেরত যান। অনেকে দুজন কিংবা তিনজন মিলে এক বস্তা সার পান।

ওই বিক্রয় কেন্দ্রের সার বিক্রেতা মতিয়ার রহমান বলেন, ‘তিন শর বেশি কৃষক। সার পাইছি ৪০ বস্তা (৩০ বস্তা ডিএপি, ১০ বস্তা টিএসপি)। দু-তিনজন মিলে একটা করে বস্তা নিছে। তা-ও কুলান যায় না। ইউরিয়া এক বস্তাও পাই নাই। এই ওয়ার্ডে আরও অন্তত দেড় শ বস্তা সার দরকার।’

লক্ষ্মীর মোড় থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে ক্যাম্প মোড়ে মেসার্স জনার্দ্দন চন্দ্র সাহা নামে বিসিআইসির ডিলার পয়েন্ট। সেখানে আসা কৃষকদের মধ্যেও সার নিয়ে উৎকণ্ঠা। সেখানে দেখা যায়, ৩ থেকে ৫ জন কৃষক মিলে দেওয়া হচ্ছে ১ বস্তা ডিএপি কিংবা টিএসপি সার। ইউরিয়া দেওয়া বন্ধ।

সেখানে সার নিতে যাওয়া ইউনিয়নের বানেরকুটি গ্রামের কৃষক ইউসুফ আলী বলেন, ‘দেড় বিঘা জমিত ধান, ৮ শতকে বেগুন। ধানোতে লাগে ২০ কেজি, পাছি ১০ কেজি। এলা কোনটাত দেই!’

ইউনিয়নের কৃষকদের অভিযোগ, যাঁরা ডিলার কিংবা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের পরিচিত, তাঁরা অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। বাকিরা ফেরত যাচ্ছেন। তবে খুচরা বিক্রেতা ও ডিলারের প্রতিনিধিরা সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন।

ডিলারের প্রতিনিধি আবুল হাসেম বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ডিএপি পেয়েছি ২৭২ বস্তা, এমওপি ১৭৮ বস্তা, ইউরিয়া ৬০ বস্তা এবং টিএসপি ৯৫ বস্তা। খুচরা বিক্রেতাদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। ইউরিয়ার চাহিদা বেশি। কম পাওয়ায় দেওয়া হয়নি। দিতে গেলে ফের গণ্ডগোল লাগবে। আরও এলে তখন দেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই ইউনিয়নে কৃষকেরা দুধকুমার নদের চরে শত শত বিঘা জমিতে বেগুন চাষ শুরু করছে। বেগুনের জন্য যে পরিমাণ সার লাগে, সে সার পাচ্ছি না।’

কৃষি বিভাগের অনুমোদিত হারে সারের বরাদ্দ নেই

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর জেলায় ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। সবজি ২ হাজার ২৫০ হেক্টর। এ ছাড়া রবি মৌসুমের আগাম বেগুন রয়েছে ৩৪৫ হেক্টর জমিতে, পরিমাণ প্রতিদিন বাড়ছে। ফুলকপি এবং বাঁধাকপি আছে প্রায় ২০০ হেক্টরে।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, মৌসুমে প্রতি হেক্টর রোপা আমনখেতে ইউরিয়া প্রয়োগের অনুমোদিত মাত্রা ১৯৫ কেজি, বেগুনে ২৬০ কেজি, ফুলকপিতে ২৬০ কেজি এবং বাঁধাকপিতে লাগে ৩৯০ কেজি।

এই হিসাবে দেখা যায়, জেলায় ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ হেক্টর রোপা আমনের জন্য ইউরিয়া সার লাগে ২৩ হাজার ৬২৯ টন। ২০০ বিঘা জমির কপির জন্য ৬৫ টন এবং ৩৪৫ হেক্টর বেগুনের জন্য লাগে প্রায় ৯০ টন। অর্থাৎ কুড়িগ্রামের মাঠে যে ফসল রয়েছে, তার জন্য শুধু ইউরিয়া প্রয়োজন ২৩ হাজার ৭৮৪ টন।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, গত জুলাই, আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসে কুড়িগ্রামের জন্য ইউরিয়া বরাদ্দ হয়েছে ১২ হাজার ৪৮৩ টন। অর্থাৎ প্রয়োজনের চেয়ে বরাদ্দ প্রায় অর্ধেক।

এ ছাড়া জেলায় টিএসপি সারের প্রয়োজন প্রায় ৬ হাজার ১৬৪ টন। কিন্তু জুলাই, আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসে টিএসপি বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ১০৪ টন।

অন্যদিকে শুধু আমনের জন্য অনুমোদিত মাত্রার ডিএপি সার লাগে ১০ হাজার ৯০৫ টন। কিন্তু বিগত তিন মাসে জেলায় ডিএপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৬৭ টন।

ঘাটতি বলতে নারাজ কৃষি বিভাগ

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘কৃষক বোরো মৌসমে অনুমোদিত হারে যে নন-ইউরিয়া সার ব্যবহার করেন, তার প্রায় ৫০ শতাংশ সার মাটিতেই থেকে যায়। সে কারণে আমন মৌসুমে সার অর্ধেক কম লাগে। তবে সব মৌসুমে ইউরিয়া অনুমোদিত মাত্রায় দিতে হয়। একই জমিতে ডিএপি দিলে আর টিএসপি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। বরং ৫ শতাংশ ইউরিয়া কম লাগে।’

অনুমোদিত মাত্রার ইউরিয়ার বরাদ্দ ঘাটতি প্রশ্নে উপপরিচালক বলেন, ‘এটা ঘটাতি নয়। এভাবেই বরাদ্দ ও ব্যবহার হয়ে আসছে। আমন মৌসুমে অনেক জমি উর্বর থাকে। যেহেতু এই সময় নিয়মিত বৃষ্টি হয়, সেই কারণে অনেক জমিতে ইউরিয়া ব্যবহারের প্রয়োজন কম হয়। বরং তখন সার দিলে ফসল নুয়ে পড়ে।’

আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় আগামসহ রবি মৌসুমে প্রচুর বেগুন চাষ হয়। কৃষকদের চাহিদার কথা বিবেচনায় ওই উপজেলার জন্য নিয়মিত বরাদ্দের বাইরে আরও ৩০০ টন ইউরিয়া এবং ৩০০ টন ডিএপি সার চাওয়া হয়েছে।’