কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নে খেওয়ার আলগারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টিতে ৮০ জন শিক্ষার্থীর জন্য পাঁচজন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। ব্রহ্মপুত্রের দ্বীপচরের এই বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষকই নিয়মিত যান না বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। দু-একজন শিক্ষক উপস্থিত থেকে দায়সারা শিক্ষকতা করে বাড়ি ফেরেন তাঁরা। কিন্তু আজ সোমবার কোনো শিক্ষকই বিদ্যালয়ে যাননি। কোনো শ্রেণিকক্ষের তালা খোলা হয়নি, উত্তোলন করা হয়নি জাতীয় পতাকাও।
আজ সকালে একে একে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়। কিন্তু বিদ্যালয়ের সব কক্ষ তালাবদ্ধ থাকায় তারা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে পারেনি। বেলা গড়িয়ে দুপুর হলে শিক্ষার্থীরা চিৎকার করে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, শিশু শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে শ্রেণিকক্ষের তালা ভাঙার চেষ্টা করে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও বিদ্যালয়টি তালাবদ্ধ ছিল। কোনো শিক্ষক বিদ্যালয়ে উপস্থিত হননি। শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি মিড-ডে মিলের খাদ্যসামগ্রীও বিতরণ করা হয়নি।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়টিতে শিক্ষকেরা নিয়মিত আসেন না। দিন ভাগ করে একেক দিন একেক শিক্ষক বিদ্যালয়ে হাজিরা দেন। তাঁদের মধ্যে আরিফা সুলতানা নামের একজন সহকারী শিক্ষক কখনোই আসেন না। কোনো হাজিরা খাতা নেই। মাসের পর মাস ধরে এভাবেই চলছে বিদ্যালয়টি।
আরিফা সুলতানা এলাকার বাইরে থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বলে, ‘মঙ্গলবার থেকে আমাদের দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন (দ্বিতীয় সাময়িকী পরীক্ষা) শুরু হবে, কিন্তু আজ কোনো শিক্ষক আসেন নাই। এমন করে অবহেলায় আমাদের স্কুলজীবন চলছে।’
বিদ্যালয়টির পাশের বাড়ির বাসিন্দা ও সাবেক শিক্ষার্থী আল-আমিন বলেন, ‘আমি নিজেও এই বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। এখন অনার্সে পড়ছি। ২০১৬ সালে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর থেকে আর পড়াশোনা হয় না। কোনো শিক্ষক নিয়মিত আসেন না। এমনিতে চরের যে অবস্থা, তার ওপর বাচ্চাদের এভাবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।’
সাবেক এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও কোনো উন্নতি হয়নি। দুই সপ্তাহ আগে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এসে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতির পরিবর্তনও হয়নি। আর আজ তো বিদ্যালয়ই খোলা হয়নি, কোনো শিক্ষকও আসেননি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইশরাত জাহানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক কলেজশিক্ষক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ‘বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি এমন অবহেলা খুবই দুঃখজনক। কিছু শিক্ষকের কর্মকাণ্ডে সরকার ও দল চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চরের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করতে হবে। জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করছি।’
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোবাশ্বের আলী বলেন, আজ (সোমবার) কোনো শিক্ষক বিদ্যালয়ে যাননি। অনুপস্থিত থাকায় প্রত্যেক শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হচ্ছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিসারদের ডেকে অভিযুক্ত সকল শিক্ষককে শোকজ করতে নির্দেশ দিয়েছি। বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় ওই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’