কুড়িগ্রামের রৌমারীতে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম সাজুর বাড়িতে মাদক উদ্ধারের অভিযান চালিয়েছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি—এসি ল্যান্ড) রাফিউর রহমান। তবে অভিযানে মাদকসংশ্লিষ্ট কোনো কিছুর হদিস মেলেনি। এদিকে ভূমির নামজারি-সংক্রান্ত একটি কাজে এখতিয়ার-সম্পর্কিত প্রশ্ন করায় ক্ষুব্ধ হয়ে এই অভিযান চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন ওই সাংবাদিক।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে এসি ল্যান্ড দুজন পুলিশ সদস্য ও কয়েকজন আনসার সদস্য নিয়ে উপজেলার সবুজপাড়ায় সাংবাদিক সাজুর বাড়িতে নিষ্ফল অভিযান চালান। এ সময় সাংবাদিক সাজু বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন।
অভিযানের বিষয়টি স্বীকার করে এসি ল্যান্ড রাফিউর রহমান দাবি করেছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই তিনি অভিযান চালিয়েছেন। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও (ইউএন) অবগত। ওই সাংবাদিকের বাড়িতে কোনো মাদক পাননি বলেও জানান তিনি।
তবে রৌমারীর ইউএনও মাহবুবুল হাসান এসি ল্যান্ডের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইউএনও বলেছেন, ‘এসি ল্যান্ডকে সার বিতরণের স্থলে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু তিনি পথিমধ্যে সাংবাদিক সাজুর বাড়িতে অভিযান চালিয়েছেন। অভিযানের আগে তিনি আমাকে কিছু জানাননি। অভিযান শেষে জানতে পেরেছি।’
এ বিষয়ে সাংবাদিক সাজু অভিযোগ করে বলেন, ‘গতকাল (বুধবার) আমি ফোনে কিছু বিষয়ে এসি ল্যান্ডকে প্রশ্ন করেছিলাম। একজন নাগরিকের জমির নামজারি করার ৭২ ঘণ্টার মধ্য বিনা নোটিশে তা বাতিল-সংক্রান্ত প্রশ্ন করায় খেপে যান এসি ল্যান্ড। সেই জেরে আমাকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে আমার বাড়িতে বেআইনিভাবে অভিযান পরিচালনা করেছেন। আমার বাড়ির জিনিসপত্র তছনছ করেছেন। তবে তিনি নিষ্ফল হয়ে ফেরত গেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য বিফলে গেছে।’
প্রসঙ্গত, এসি ল্যান্ড রাফিউর রহমানের বদলির আদেশ হয়েছে। তাঁকে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। এসি ল্যান্ড রাফিউর রহমানের বিরুদ্ধে ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা দেওয়া ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম সাজু অভিযোগ করে জানান, গত ২৭ আগস্ট এসি ল্যান্ড রাফিউর রহমান উপজেলার দাঁতভাঙা ইউনিয়নের আমবাড়ি গ্রামের একটি জমির নামজারি করেন। ৩০ আগস্ট সেই নামজারি কোনো প্রকার নোটিশ ও শুনানি ছাড়াই বাতিল করেন।
সাংবাদিক সাজু বলেন, ‘সেটি তিনি করতে পারেন কি না, বুধবার সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে তাঁকে এ নিয়ে প্রশ্ন করি। এতে তিনি খেপে যান। আমাকে উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘‘আমি কী করতে পারি আর না পারি, সে জবাব আপনাকে দেব?’’ সেই প্রশ্নের জের ও ক্ষোভ থেকে আজ মাদক মজুতের ধোঁয়া তুলে পুরো বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছেন।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে সাজু বলেন, অভিযান ছিল একটা সাজানো নাটক। এসি ল্যান্ড ভয়াবহ রকমের প্রতিশোধপরায়ণ। তিনি সাংবাদিক ও সাংবাদিকের প্রশ্ন সহ্য করতে পারেন না। রৌমারীতে তিনি অবাধে অনিয়ম করে গেছেন।
অভিযানের পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন এসি ল্যান্ড রাফিউর রহমান। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। পুলিশের একজন এসআইকে প্রসিকিউশনের দায়িত্ব দিয়ে অভিযান করা হয়। তবে কিছু পাওয়া যায়নি।
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত না করে কারও বাড়িতে এভাবে অভিযান পরিচালনা করা যায় কি না, এমন প্রশ্নে এসি ল্যান্ড বলেন, ‘ইউএনও স্যারকে জানিয়ে গিয়েছি।’
ইউএনও অবগত ছিলেন না—এমন মন্তব্যের প্রত্যুত্তরে এসি ল্যান্ড বলেন, ‘বিষয়টি সত্যি নয়। আমি বলে গিয়েছি। উনি জানেন।’
সাংবাদিকের বাড়িতে মাদক উদ্ধার অভিযানে স্থানীয় কাউকে সঙ্গে নিয়েছিলেন কি না—এমন প্রশ্নে এসি ল্যান্ড বলেন, ‘আপনি কি আমাকে সবক দিচ্ছেন? সাক্ষী কি সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে? ওখানে এমনিতেই অনেক উৎসুক জনতা ছিল।’
বিষয়টি নিয়ে ইউএনও মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘তাঁকে (এসি ল্যান্ড) সারের বিষয় দেখার জন্য পাঠানো হয়েছিল। সাংবাদিকের বাড়িতে অভিযানের বিষয়ে আমাকে বলেনি। আমি পরে বিষয়টি জেনেছি। এ নিয়ে সাংবাদিক সাজুর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। জমির নামজারি-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো প্রক্রিয়াগত ত্রুটি হলে আমি ফের শুনানি নেব।’
এ বিষয়ে রৌমারী রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এই এসি ল্যান্ড ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। শুধু প্রতিশোধপরায়ণতা থেকে সাংবাদিক সাজুর বাড়িতে বেআইনিভাবে এই অভিযান চালিয়েছেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে অফিসের চেইনম্যানকে মাধ্যম করে ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।’
এ সাংবাদিক নেতা আরও বলেন, ‘এ ছাড়া তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। তাঁর অফিসে ঘুষ-বাণিজ্য ও দালাল-সংক্রান্ত প্রশ্ন করায় তিনি কয়েকজন সাংবাদিককে তাঁর অফিস থেকে বের করে দিয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতি দাবি জানাচ্ছি।’
সার্বিক বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।