৫০ ঘণ্টা পার হলেও এখনো দুই শিশুসন্তান নিয়ে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশ ইন চেষ্টার শিকার সুমি আক্তার-বেলাল হোসেন দম্পতি। বিএসএফ-বিজিবির অনড় অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ কিংবা ভারত কোনো রাষ্ট্রেই তাঁদের স্থায়ী ঠাঁই দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি। মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুর সাড়ে ১২টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ওই দম্পতি ও তাঁদের দুই শিশুসন্তানসহ ছয় নাগরিক গয়টাপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে অবস্থান করছিলেন। তাঁদের ঘিরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা অতন্দ্র পাহারায় রয়েছেন।
এর আগে গত রোববার (১৪ জুন) সকাল ৬টার দিকে উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তপথে নারী-শিশুসহ ছয়জন এবং ইজলামারী সীমান্তপথে আরও তিনজনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পুশ ইনের চেষ্টা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। কাঁটাতারের এপারে বাংলাদেশ প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হলেও বিজিবি এবং স্থানীয় গ্রামবাসীর বাধায় তাঁদেরকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পাঠাতে পারেনি বিএসএফ। এখনো নারী-শিশুসহ ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন।
গয়টাপাড়া সীমান্তে গিয়ে দেখা গেছে, সীমান্তের শূন্যরেখার একদিকে বিএসএফ, অরেক দিকে বিজিবি। মাঝখানে দুই শিশুসন্তান নিয়ে অসহায় বসে আছেন সুমি আক্তার-বেলাল হোসেন দম্পতি। খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি-তাপপ্রবাহ সয়ে আজ তৃতীয় দিনের মতো এভাবে বসে আছেন তাঁরা। বাংলাদেশের স্থানীয় বাসিন্দারা মাঝেমধ্যে তাঁদের কাছে গিয়ে কখনো পানি, আবার কখনো খাবার সরবরাহ করছেন। দুই শিশুর মায়ায় এগিয়ে যাচ্ছে গ্রামের শিশুরাও।
এদিকে প্রচণ্ড গরম আর বৈরী আবহাওয়ায় দুই শিশুসন্তানের সুস্থতা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সুমি-বেলাল দম্পতি। সন্তানদের কথা বিবেচনা করে তাঁদের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে দুই রাষ্ট্রের সরকারের প্রতি অনুরোধ তাদের।
শিশুসন্তানদের জীবন বাঁচাতে আকুতি জানিয়ে মা সুমি আক্তার বলেন, ‘কোন দেশে নেবেন নেন, কিন্তু এভাবে ফেলায় রাখিয়েন না। গরমে অসুস্থ হয়ে বাচ্চাগুলা মরে যাবে। আমরা বাঁচতে চাই।’ ‘আমার শিশুসন্তানেরা অসুস্থ হয়ে গেছে, তাদের চিকিৎসা করা দরকার। ঠিকমতো খাবারও খাওয়াতে পারছি না। ওদেরকে কীভাবে বাঁচাই! আমরা বাঁচতে চাই’ অসহায় আকুতি মায়ের।
সুমি আক্তার ও বেলালের দাবি, তারা বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুল গ্রামের বাসিন্দা। কয়েক মাস আগে সিলেট সীমান্তপথে তারা ভারতে পাড়ি জমান। পরে বিএসএফ তাদের ধরে নিয়ে গত রোববার ভোরে সীমান্তের কাঁটাতার পার করে দেয়। কিন্তু বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধায় তাঁরা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারেননি।
বিজিবি জানায়, বিএসএফ সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে রৌমারীর দুই সীমান্তপথে ৯ জনকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিরা কাঁটাতারের এপারে শূন্যরেখার কাছে ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থান করলেও তাঁদের ফেরত নেয়নি বিএসএফ। বিজিবিও তাঁদেরকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেয়নি।
বিজিবি আরও জানায়, পুশ ইন চেষ্টার পর রোববার দুপুরে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হয়। তবে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিরা বাংলাদেশি কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে। বিজিবির ভাষ্য, আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অনুযায়ী এভাবে কাউকে ঠেলে দিতে পারে না বিএসএফ।
বিজিবি ৩৫ ব্যাটালিয়নের গয়টাপাড়া ক্যাম্প কমান্ডার সুবেদার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিরা শূন্যরেখার কাছে আগের অবস্থানেই আছেন। গরমে তাঁদের বিশেষ করে দুই শিশুর কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। রোববার কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠক হলেও কোনো সুরাহা হয়নি। এখন পর্যন্ত (মঙ্গলবার দুপুর) নতুন কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। দিন-রাত ওই ছয়জনকে ঘিরে দুই প্রান্তে পাহারা দিচ্ছে বিজিবি ও বিএসএফ। এলাকাবাসীও সহায়তা করছে।’