হোম > সারা দেশ > কিশোরগঞ্জ

৮ মাসে ৯ জনের এইচআইভি শনাক্ত, স্বাস্থ্য বিভাগের ভিন্নমত

সাজন আহম্মেদ পাপন, কিশোরগঞ্জ 

প্রতীকী ছবি

কিশোরগঞ্জে গত ৬ বছর ৮ মাসে দেড় হাজার ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষা করে ২৬ জন এইচআইভি রোগী শনাক্তের দাবি করেছে বেসরকারি সংস্থা বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। এর মধ্যে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাসেই ৯ জন রোগী শনাক্ত করা হয়। তবে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ২ বছর আট মাসে নির্ণয় হওয়া দুজন আক্রান্তের তথ্য রয়েছে তাদের কাছে।

মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয় এইচআইভি; যা মরণব্যাধি এইডসের জন্য দায়ী।

পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য, জীবনমান নিয়ে কাজ করে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁরা কিশোরগঞ্জ জেলায় ২০২০ সাল থেকে গত আগস্ট পর্যন্ত দেড় হাজার মানুষের নমুনা পরীক্ষা করেছেন। এর মধ্যে ২৬ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। তাঁরা সবাই পুরুষ। শনাক্ত হওয়া এসব রোগীর ২২ জনই সংস্থাটির ভৈরব কার্যালয়ের অধীনে থাকা ছয় উপজেলা ভৈরব, কুলিয়ারচর, বাজিতপুর, নিকলী, অষ্টগ্রাম, কটিয়াদী থেকে এবং কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ের অধীন বাকি সাতটি উপজেলা থেকে চারজন শনাক্ত হয়েছেন। চলতি বছরের ৯ জনের মধ্যে ভৈরব কার্যালয়ের অধীনে থাকা ছয় উপজেলায় পাঁচজন এবং কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ের অধীনে থাকা সাত উপজেলায় চারজন শনাক্ত হন।

বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি সূত্র জানায়, কিশোরগঞ্জে ২০১০ সাল থেকে বিভিন্ন উপজেলায় এইচআইভি রোগী অনুসন্ধানের কাজ করছে সংস্থাটি। তবে শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় বা তাঁরা ঠিক কোন এলাকায় বসবাস করেন, সে তথ্য তারা দেন না। তাঁদের ভাষ্য, এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিচয় অত্যন্ত গোপনীয় বিষয়। রোগীদের সঙ্গে সেই গোপনীয়তা রক্ষা করেই পরীক্ষা করা হয়েছে।

সংস্থাটি বলছে, নমুনা পরীক্ষার জন্য হাওরবেষ্টিত জেলাটির রাস্তায় ভাসমান বসবাস করা মানুষ, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ও ভারী যানবাহনের চালক, নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি, সমকামী, পোশাকশ্রমিক ও বিদেশফেরত প্রবাসীদের বেছে নেওয়া হয়। এইচআইভির জন্য এসব খাতের মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ২৬ জন শনাক্ত ব্যক্তির মধ্যে কোন জনগোষ্ঠীর কতজন রয়েছেন, সে তথ্য গোপন রেখেছে সংস্থাটি। এমনকি রোগীদের ব্যক্তিগত পরিচয়, বসবাসের নির্দিষ্ট এলাকা বা অন্য কোনো প্রোফাইলও প্রকাশ করেনি তারা।

নাম গোপন রাখার শর্তে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির এক ব্যবস্থাপক আজকের পত্রিকাকে বলেন, কোনো ব্যক্তির শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হওয়ার পর তাঁকে এআরটি (অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি) চিকিৎসার আওতায় আনা হয়। এই চিকিৎসা বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। পাশাপাশি রোগীদের নিয়মিত ফলোআপও করা হয়।

এইচআইভি রোগী শনাক্তের বিষয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। সমন্বয় সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি আতা মোহাম্মদ ওবায়েদ বলেন, এটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। কিশোরগঞ্জ হাওরবেষ্টিত জেলা। ভৈরবে গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জংশন রয়েছে। এ ছাড়া সড়ক ও নৌপথেও মানুষের চলাচল রয়েছে। এসব কারণে এইচআইভি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিষয়টি নজরে এনে প্রথমে গত বুধবার কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাইদুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিশোরগঞ্জের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত কোনো এইচআইভি রোগী শনাক্ত হয়নি।

পরে গতকাল বৃহস্পতিবার আজকের পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে ‘কিশোরগঞ্জে এইচআইভিতে আক্রান্ত ২৬ জন, সরকারি হিসাবে শূন্য’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাইদুর রহমান এই প্রতিনিধিকে জানান, সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জেলায় দুজনের এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। দুজনই শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শনাক্ত হয়েছেন। প্রথমে তাঁর সঠিক তথ্যটি জানা ছিল না।

এইচআইভি রোগের বিষয়ে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (মেডিসিন) আবিদুর রহমান ভূঁইয়ার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক, সংক্রমিত রক্ত গ্রহণ এবং ব্যবহৃত বা অপরিষ্কার সুচ ও সিরিঞ্জ ভাগাভাগির মাধ্যমে এইচআইভি ছড়াতে পারে। এ ছাড়া আক্রান্ত মায়ের মাধ্যমে গর্ভাবস্থা, প্রসব বা বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় শিশুও সংক্রমিত হতে পারে। প্রবাসফেরত জনগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন বলেও তিনি পরামর্শ দেন।