মাছের প্রজনন মৌসুমে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন হাওরাঞ্চলে ২৮ মে থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত সব প্রজাতির মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। তবে বিকল্প জীবিকা, খাদ্য সহায়তা ও প্রণোদনার অভাবে অনেক জেলে এই নিষেধাজ্ঞা মানতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন জেলে ও মৎস্য বিভাগ-সংশ্লিষ্টরা।
মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশীয় প্রজাতির মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের মতো এবারই প্রথম হাওরাঞ্চলেও মাসব্যাপী এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল, নদ-নদী ও ভাসান পানিতে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাকবে।
নিষিদ্ধ সময়ে মাছ শিকার বন্ধ রাখতে তিন উপজেলায় হাট-বাজার ও জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছে মৎস্য বিভাগ। পাশাপাশি অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে জেলেরা বলছেন, মাছ ধরে হাট-বাজারে বিক্রি করেই তাঁদের সংসার চলে। অন্য কোনো পেশা না থাকায় মাছ ধরা বন্ধ হলে পরিবার নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
অষ্টগ্রাম উপজেলার কলমা ইউনিয়নের জেলে বিশ্ব চন্দ্র দাস (৫৫) বলেন, “মাছ ধরা বন্ধ রাখলে তো পেটের খিদা বন্ধ থাকবে না। আমরা সরকারি নিষেধ মানতে চাই, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সময় সরকার খাদ্য সহায়তা ও প্রণোদনা না দিলে আমরা চলতে পারব না।”
মিঠামইন উপজেলার কাটখাল ইউনিয়নের জেলে আমির হোসেন (৪২) বলেন, “আমরা সরকারি আইন মানতে বাধ্য, তবে সরকারকেও সমানভাবে আমাদের সাহায্য করতে হবে। এক মাস মাছ না ধরলে খামু কী? বউ পোলাপান নিয়ে চলি এই মাছ বেঁচার ট্যাকায়।”
এক ফসলি হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটা শেষে বর্ষা মৌসুমে প্রান্তিক কৃষকদের অনেকেই মাছ ধরে খাদ্য চাহিদা পূরণ ও দৈনন্দিন খরচ মেটান। ফলে নিবন্ধিত জেলেদের পাশাপাশি মৌসুমি জেলেরাও এ নিষেধাজ্ঞার ভুক্তভোগী।
সংশ্লিষ্ট মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ হাওরাঞ্চলে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৩৩ হাজার ১৯০। এর মধ্যে অষ্টগ্রামে ৮ হাজার ৭৭৯, ইটনায় ১২ হাজার ৯৩৪ এবং মিঠামইনে ১১ হাজার ৪৭৭ জন। স্থানীয়দের মতে, মৌসুমি জেলেসহ তিন উপজেলায় এ সংখ্যা আরও ১০ থেকে ১২ হাজার বাড়তে পারে।
হাওর উন্নয়নবিষয়ক সামাজিক সংগঠন ‘হাওর অঞ্চলবাসী’র সম্পাদক কামরুল হাসান বাবু বলেন, “এক মাস মৎস্য শিকার নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে হাওরাঞ্চলে মা মাছ, পোনা মাছ সংরক্ষণ ও মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে। তবে, জেলেদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। এবার হাওরাঞ্চলে ব্যাপক ফসলহানির কারণে এমনিতেই জেলেদের জীবনযাপন অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ছে। তাই মাছ ধরা নিষিদ্ধ সময়ে ‘উপকূলীয় মডেলে’ জেলেদের জন্য সরকারিভাবে খাদ্য ও নগদ প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। এতে জেলেরা আর্থিকভাবে সুরক্ষা পাবেন, নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে উৎসাহিত হবেন।”
ইটনা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাজিব দাস বলেন, “সরকারি নির্দেশনায় নিষিদ্ধ সময়ে মাছ না ধরতে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে জেলেদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না থাকায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে বেগ পেতে হচ্ছে। নিষিদ্ধ সময়ে জেলেরা বেকার থাকলে তাদের জীবিকার্জন কষ্টসাধ্য, তাই সরকারি খাদ্য সহায়তা বা প্রণোদনার ব্যবস্থা দাবি করছেন মৎস্যজীবীরা।”