কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মস্থলে নিরাপত্তা, বেতনবৈষম্য দূরীকরণসহ ছয় দফা দাবিতে আজ রোববার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। একই দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মেডিকেল কলেজে ‘একাডেমিক শাটডাউন’ কর্মসূচি দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।
আকস্মিক এই কর্মবিরতির কারণে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দূরদূরান্ত থেকে আসা সাধারণ ও অসহায় রোগীদের ওপর।
ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিই) সভাপতি মো. আবু ইউসুফ ও সাধারণ সম্পাদক মো. আদনান কবির স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে আজ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। এর আগে ছয় দফা দাবিতে গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের অভিযোগ, সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক নোটিশে চিকিৎসকদের ওপর বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক প্রস্তাব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা ইন্টার্ন ও ট্রেইনি চিকিৎসকদের বেতন বৃদ্ধি, এফসিপিএস কোর্সের চিকিৎসকদের বেতনবৈষম্য দূর করা, ভর্তি পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি প্রত্যাহার এবং কর্মস্থলে নিরাপত্তার দাবিতে আবেদন জানিয়ে আসছিলেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা বলেন, বারবার দাবি জানানো সত্ত্বেও প্রশাসন কেবল তাঁদের আশ্বাসই দিয়েছে, দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার কারণেই তাঁরা এই চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
চিকিৎসকদের ঘোষিত ছয়টি মূল দাবি হলো—এফসিপিএস পার্ট-১ উত্তীর্ণ বেসরকারি প্রশিক্ষণার্থীদের পদায়ন-সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা বাতিল করা; বিএমইউ ও বিসিপিএসের ভর্তি পরীক্ষার ফি কমিয়ে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা নির্ধারণ করা; ইন্টার্নদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা এবং ট্রেইনি চিকিৎসকদের বেতন নবম গ্রেডের সমপর্যায়ে নির্ধারণ করা; চিকিৎসকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে বিশেষ আইন পাস করা; বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩৪ বছর করা এবং শ্রম আইন অনুযায়ী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকদের জন্য সুনির্দিষ্ট জাতীয় বেতনকাঠামো তৈরি করা।
শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আবু ইউসুফ বলেন, ‘চলমান আন্দোলনের ছয় দফা দাবি পূরণ হওয়ার আগপর্যন্ত ইন্টার্ন কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে। ডাক্তারদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ও যৌক্তিক দাবি আদায়ে সব অবস্থান থেকে সোচ্চার হওয়া এখন সময়ের দাবি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুস্তাকিন দিপু বলেন, সারা দেশের চিকিৎসক সমাজ ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত ছয় দফা দাবি না মানা পর্যন্ত ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম বর্জন করা হচ্ছে।
এদিকে চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে ভোগান্তিতে পড়া ষাটোর্ধ্ব রহিমা বেগমের স্বজন মো. আলমগীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সকাল ১০টায় রোগীরে নিয়া আইছি। এহন দুপুর পার হইয়া গেল, ডাক্তার দেহাইতে পারি নাই। হুনতাছি ডাক্তাররা নাকি ধর্মঘট করতাছে। আমাগো মতো গরিব মাইনষের জীবন নিয়া এইড্যা কেমুন খেলা?’
শিশু ওয়ার্ডে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত সন্তানকে নিয়ে আসা বাবা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘ডাক্তারদের দাবিদাওয়া থাকতেই পারে, কিন্তু আমাগো নিষ্পাপ বাচ্চাগো জিম্মি কইরা কেন? নার্সরা ওষুধ দিতাছে ঠিকই, কিন্তু বাচ্চার শ্বাসকষ্ট বাড়লে যে ডাক্তার দেখব, সেই ডাক্তারই তো নাই। হাসপাতালডা এহন এক মরণফাঁদ!’
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক চিকিৎসক নাসিরুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের হাসপাতাল অন্যান্য মেডিকেল কলেজের তুলনায় বেশ ছোট। যার কারণে আমাদের এখানে মিড লেভেল বা মেডিকেল অফিসার পর্যায়ের ডাক্তারের সংখ্যা খুবই কম। হাসপাতালের বহির্বিভাগেও কিছু ইন্টার্ন দায়িত্ব পালন করেন, তবে তাঁদের মূল পদচারণা এবং কাজের চাপ থাকে অন্তর্বিভাগে (ইনডোরে)। মিড লেভেল ডাক্তারের সংকটের কারণে এই কর্মবিরতিতে আমরা সমস্যায় পড়েছি।’
শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ চিকিৎসক একরাম আহসান জুয়েল বলেন, ‘অধ্যক্ষ স্যার ছুটিতে আছেন। উনি আজ রাতে আসবেন। অধ্যক্ষ স্যারের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’