আজ আন্তর্জাতিক সমমজুরি দিবস
ভোরের আলো ফোটার আগেই দুপুরের খাবার হাতে দল বেঁধে হাওরে যান নারী কৃষিশ্রমিকেরা। ধান রোপণ, পরিচর্যা ও আগাছা নিধনসহ বিভিন্ন কৃষিকাজ করেন তাঁরা। দুপুরে জমির আইলে বসে বাড়ি থেকে আনা খাবার খান। ওই একদণ্ডই তাঁদের বিশ্রাম। বোরো ও রোপা আমনের মৌসুমে কিশোরগঞ্জের হাওরগুলোর চিরচেনা এ দৃশ্য।
কৃষি মৌসুমে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের বিভিন্ন হাওরে শত শত নারী কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক সমমজুরি দিবস তাঁদের জন্য নতুন কোনো অর্থ বহন করে না। উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও তাঁদের কপাল ফেরে না। একজনের আয়ে সংসার না চলায় ঘরের কাজের পাশাপাশি এসব নারী মাঠে নেমে আসেন কৃষিকাজের জন্য। কৃষিকাজে তাঁদের চাহিদাও রয়েছে। কিন্তু মজুরি এখনো বৈষম্যমূলক।
আজ শুক্রবার সকালে অষ্টগ্রাম উপজেলা সদর ও পূর্ব অষ্টগ্রাম ইউনিয়নের একাধিক হাওর ঘুরে দেখা যায়, পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি রোপা আমন ধান রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন নারী শ্রমিকেরা।
এখানে কৃষিকাজে নারীদের কদর বা চাহিদা বেশি হলেও মজুরি পুরুষের অর্ধেক। ধান রোপণ, পরিচর্যা ও আগাছা নিধনসহ কৃষির যেসব কাজ করে তাঁরা দিনশেষে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পান, সেই একই কাজে পুরুষ শ্রমিকেরা পান ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার বেশি।
নারী শ্রমিকেরা জানান, স্বামীর একার আয়ে সংসার চলে না। তাই সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হন তাঁরা। তবে এই মজুরি বৈষম্যের অবসান চান তাঁরা।
কলমা ইউনিয়নের কৃষিশ্রমিক সূচনা রাণী দাস (৪৩) বলেন, ‘কাম করি বেশি, মাইনে পাই কম। এই সমমজুরি দিবস কিতা জানি না। তয় যদি পরিশ্রমের মাইনে একটু বেশি মিলত, তাহলে ঝি-পুত নিয়ে সংসার ভালো চলত।’
পূর্ব অষ্টগ্রাম ইউনিয়নের কৃষিশ্রমিক সবিতা সরকার (৩২) বলেন, ‘আমরা এইটা কোনো দিবসের খোঁজখবর রাখি না, পাইও না। কাম করি, সংসার চলে; তবে কামের তুলনায় বেতন মিলে কম। কী করমু, এই বাজারে সংসার চালাতে একজনের টাকায় হয় না, তাই কাম করি।’
অষ্টগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু বলেন, ‘দেশে নারী-পুরুষ প্রায় সমসংখ্যক। এ দেশের নারীরা কৃষিসহ সব কাজ করছে, তা আশার কথা। তবে শ্রম মজুরির বৈষম্য যদি তাদের পিছিয়ে দেয়, তা হবে দুঃখজনক। এ জন্য সমন্বিত শ্রম নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।’
মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. ওবায়দুল ইসলাম খাঁন অপু বলেন, ‘হাওরাঞ্চলে নারী-পুরুষের শ্রম উৎপাদন সমান নয়, ফলে মজুরিতে ব্যবধান রয়েছে। তবে আমি মনে করি, কৃষিকাজে শ্রমশক্তি বাড়াতে মজুরি বৈষম্য কমানো উচিত। এতে নারীরা স্বাবলম্বী ও কর্মমুখী হবেন। সর্বোপরি দেশের শ্রমশক্তি ও উৎপাদন বাড়বে।’
কিশোরগঞ্জ কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিচালক সৈয়দা সায়মা বেগম বলেন, ‘আমরা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক শ্রম মজুরির বিষয়টি দেখি। তবে কৃষিতে নারী শ্রমিকের মজুরি বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’