আমন মৌসুম শুরু হয়েছে। কৃষকেরা জমি প্রস্তুত করছেন। বীজতলা থেকে চারা তোলা হচ্ছে। কোথাও কোথাও চারা রোপণও শুরু হয়েছে। তবে কৃষকেরা সারের দোকানে গিয়ে সার পাচ্ছেন না। ডিলাররা বলছেন, চাহিদার তুলনায় বিসিআইসি ও বিএডিসি তাঁদেরকে সার সরবরাহ করছে না। এ পরিস্থিতিতে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।
সরেজমিনে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষক, ডিলার ও সারের খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। কৃষকেরা বলছেন, সার সংকটের কারণে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছ তাঁদের।
সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের বালিয়াবাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বর্ষার পানি নেমে যাওয়ায় একরের পর একর জমি ভেসে উঠেছে। সেখানে ট্রাক্টর দিয়ে হাল চাষ করছেন কৃষকেরা। হালের পর মই দিয়ে জমি সমান করছেন কেউ কেউ। সেখানে কথা হয় সিন্দ্রীপ গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নানের (৬৬) সঙ্গে। আমন আবাদ করবেন, সে অনুযায়ী জমি প্রস্তুত করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী জমি প্রস্তুতের সময় শেষ চাষের আগে ডিএপি বা টিএসপি সার দিতে হয়। আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বীজতলায় ৩৫ টাকা কেজি করে ইউরিয়া সার কিনে দিতে পেরেছিলাম। কিন্তু রোপণ করার জমিতে সার দেওয়ার জন্য দুই দিন ধরে ঘুরছি। কোনো সার পাচ্ছি না। এখন সার ছাড়াই জমি রোপণ করতে হবে।’
উপজেলার বারঘরিয়া ইউনিয়নের চাতল বাজারের বিএডিসি অনুমোদিত বীজ ডিলার মেসার্স ভূঁইয়া ট্রেডার্সে গিয়ে দেখা যায় সেখানে চার বস্তা ইউরিয়া সার, খোলা বস্তায় দুই থেকে তিন কেজি ডিএপি, কয়েক কেজি টিএসপি ও ১৫ থেকে ১৬ কেজির মতো এমওপি সার নিয়ে বিক্রির জন্য বসে আছেন প্রোপাইটার আসাদুজ্জামান রিপনের বাবা আক্কাস আলী মেম্বার। সার কোনটা কত টাকা করে বিক্রি করছেন? জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলেন, ‘ডিএপি ও টিএসপি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, এমওপি ২২ টাকা এবং ইউরিয়া সার ৩৫ টাকা কেজি করে বিক্রি করছি।’
অথচ এই দোকানেই টাঙানো লাল বোর্ড মূল্য তালিকায় লেখা আছে ইউরিয়া প্রতি কেজি ২৭ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা ও এমওপি ২০ টাকা। একটু পরেই দোকানে এসে বসলেন প্রোপাইটার আসাদুজ্জামান রিপন। এ সময় নোয়াবাদ ইউনিয়নের ভাঙ্গাখালী গ্রামের জয়নাল মিয়া (৫২) নামের এক কৃষক তাঁর দোকানে এলেন সার কিনতে। জয়নাল মিয়া ২০ কাঠা জমিতে এবার আমন আবাদ করবেন। ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে তাঁর দুই বস্তা সারের প্রয়োজন। সার নেই বলে কৃষককে ফিরিয়ে দেন আসাদুজ্জামান রিপন।
কৃষক জয়নাল মিয়া বলেন, ‘কয়েক বাজার ঘুরে এখানে এসেছি। কোনখানেই সার পাচ্ছি না। এখন যে অবস্থা সার ছাড়াই চারা রোপণ করতে হবে। এতে ধানের ফলন কম হবে।’
বাজারের খুচরা সার বিক্রেতা মো. খোকন মিয়া বলেন, ‘প্রতিদিনই এখন কৃষকেরা আসছেন সার নিতে। আমরা সার দিতে পারছি না। আমরা ডিলারদের কাছ থেকে সার আনি। ডিলাররা আমাদেরকে সার দিচ্ছে না। ডিলাররা বলছে সারের নাকি সংকট।’
চাতল বাজারে চায়ের স্টলে বসে কথা হয় নোয়াবাদ ইউনিয়নের সিঙ্গুয়া গ্রামের কৃষক মো. আসাদুল্লাহর (৫৫) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দুই একর জমিতে আমি এবার আমন আবাদ করব। এর মধ্যে এক একর জমি সার ছাড়াই রোপণ করে ফেলেছি। বাকি এক একর জমি প্রস্তুত করে রেখেছি রোপণের জন্য। কিন্তু সার পাচ্ছি না। সারের দোকানে গেলে দুই-তিন কেজি করে সার দিতে চায়, তাও আবার দাম বেশি চায়।’
জহিরাবাদ গ্রামের কৃষক শাহাবুদ্দীন (৫০) ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘তিন কাঠা জমিতে হাল চাষ করে রেখেছি। বৃষ্টি হলেই জমি রোপণ করে ফেলতে হবে। কিন্তু সার পাচ্ছি না। দোকানে গেলে কয় সরকার নাকি সরকারে দিচ্ছে না।’
একই সময়ে জেলার পাকুন্দিয়া, কটিয়াদী ও হোসেনপুর উপজেলায়ও সার সংকটের খবর পাওয়া গেছে। কটিয়াদী উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের নাগেররগ্রামের কৃষক আব্দুল খালেক (৬০) বলেন, ‘আমি তিন দিন ধরে ধরনা দিয়েও এক বস্তা সার জোগাড় করতে পারিনি। সারের ডিলাররা কয় সার নাই। দোকানে গেলেও সার পাই না।’
তবে সার সংকট কথা অস্বীকার করেছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান। তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, ‘কিশোরগঞ্জে এ বছর ৮৫ হাজার ৪০০ হেক্টর রোপা আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৭ শতাংশ জমি রোপণ করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেলায় ইউরিয়া সারের চাহিদা ৫৩ হাজার ৪১২ মেট্রিক টন, টিএসপি সারের চাহিদা ১২ হাজার ১৬ টন, ডিএপি সারে চাহিদা ২৪ হাজার ৭০০ টন এবং এমওপি সারের চাহিদা ১৮ হাজার ১৬৫ টন। চাহিদার বিপরীতে কিশোরগঞ্জে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। সারের কোনো সংকট নাই। এরপরেও কৃষকেরা কেন সার পাচ্ছেন না আমরা খোঁজ নিয়ে দেখছি।’
জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, ‘জেলায় কৃষিজমির আয়তন ও চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চাহিদা যদি বাড়ে তাহলে আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’