কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার শ্রীনগর গ্রামে টাকাপয়সা ও ইয়াবা সরবরাহ নিয়ে বিরোধের জেরে সোহেল মিয়া ও তাঁর ভাই ফয়সাল মিয়াকে শিকলে বেঁধে রেখেছিলেন হাকিম মিয়া। পরে শ্রীনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মানিক মিয়া লোকজন নিয়ে তাঁদের ছাড়িয়ে নেন বলে অভিযোগ করেছেন হাকিম মিয়া। এ ঘটনায় সোহেল ও হাকিম আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
গতকাল বুধবার বিকেলে শ্রীনগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এতে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, শ্রীনগর গ্রামের হাসান আলীর ছেলে সোহেল মিয়ার সঙ্গে একই গ্রামের মৃত আমির হোসেনের ছেলে হাকিম মিয়ার টাকাপয়সা ও ইয়াবা সরবরাহ নিয়ে বিরোধ চলছিল। গতকাল বিকেলে পাঁচ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট সরবরাহের বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সোহেলের ভাই ফয়সাল আরও একজনকে নিয়ে ঘটনাস্থলে এলে হাকিমের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে সোহেল ছুরি দিয়ে হাকিমকে আঘাত করেন। পরে হাকিম ঘর থেকে লাঠি এনে সোহেলকে মারধর করেন এবং দুই ভাইকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন।
স্থানীয় বাসিন্দা বুলবুল মিয়া বিষয়টি ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) জানান। পরে উপপরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান ঘটনাস্থলে যান। তবে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই সোহেল ও ফয়সালকে সেখান থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
হাকিম মিয়ার অভিযোগ, ইউপি সদস্য মানিক মিয়া লোকজন নিয়ে তাঁর বাড়িতে এসে জোরপূর্বক সোহেল ও ফয়সালকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান।
স্থানীয় বাসিন্দা সাত্তার মিয়া বলেন, ‘প্রথমে তাঁদের মধ্যে টাকাপয়সা নিয়ে বিরোধ ছিল। পাঁচ হাজার পিস ইয়াবা হাকিমকে দেওয়ার কথা থাকলেও তা না দিয়ে ওসমান নামের অন্য এক মাদক কারবারিকে দেওয়া হয়েছে বলে শুনেছি। এ নিয়ে হাকিম ও সোহেলের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়।’
সাত্তার মিয়া বলেন, একপর্যায়ে সোহেল ছুরি দিয়ে হাকিমকে আঘাত করেন। পরে হাকিম সোহেল ও ফয়সালকে বেঁধে রাখেন। তবে পুলিশ যাওয়ার আগেই ইউপি সদস্য মানিক মিয়া লোকজন নিয়ে দুজনকে ছাড়িয়ে নেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ওই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
হাকিম মিয়া জানান, সোহেল প্রথমে তাঁর মা-বাবাকে গালিগালাজ করেন। পরে টেকনাফ থেকে আসা ইয়াবা কার কাছে সরবরাহ করা হয়েছে, তা জানতে তিনি সোহেলকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সোহেল তাঁকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন বলে দাবি করেন হাকিম।
হাকিম মিয়া বলেন, ‘পরে ঘর থেকে লাঠি এনে সোহেলকে মারধর করে দুই ভাইকে শিকল দিয়ে তালা দিই।’ তাঁর দাবি, পুলিশের সামনে টেকনাফের এক ব্যক্তিকে ফোন করে তিনি জানতে পারেন, ফয়সালের কাছে পাঁচ হাজার পিস ইয়াবা পাঠানো হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
হাকিম মিয়া আরও বলেন, ‘মাদক কেনাবেচার বিষয়ে আমার কাছে প্রমাণও আছে। পুলিশের সামনে টেকনাফের লোককে ফোন করে পাঁচ হাজার পিস ইয়াবা ফয়সালকে সরবরাহের বিষয়টি লাউডস্পিকারে শোনাতে চাইলে পুলিশ কল কেটে দিতে বারণ করে।’
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগগুলোর তদন্ত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
ইউপি সদস্য মানিক মিয়া দুই ভাইকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, সোহেলকে আটকে রাখার খবর শুনে সোহেলের পরিবারের সদস্যরা তাঁর কাছে গেলে তিনি হাকিমের বাড়িতে যান। হাকিম টাকাপয়সা লেনদেনের কথা বললে তিনি পাঁচজনকে নিয়ে বসে বিষয়টি সমাধানের প্রস্তাব দেন এবং দুই ভাইকে ছাড়িয়ে আনেন।
মানিক মিয়া বলেন, ‘আগে-পরে কী হয়েছে বা ইয়াবা নিয়ে কিছু আছে কি না, তা আমি জানি না।’ তবে সোহেল ও ফয়সালকে এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ভৈরব থানার উপপরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পাঁচ হাজার পিস ইয়াবার বিষয় নিয়ে দুই ব্যক্তিকে আটকে রাখার কথা জেনেছিলেন। তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি সোহেল ও ফয়সালকে পাননি।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, টাকাপয়সা নিয়ে বিরোধ হয়েছে। পরে সামাজিকভাবে বিষয়টি মীমাংসা করা হবে বলে জানতে পারি।’ তাঁর ভাষ্য, ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর হাকিম মিয়া তাঁকে পাঁচ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেটের কথা বলেননি; শুধু টাকা পাওয়ার কথা বলেছেন। বুলবুল মিয়াও তখন ইয়াবার বিষয়ে তাঁকে কিছু বলেননি।