হোম > সারা দেশ > কিশোরগঞ্জ

কিশোরগঞ্জ: হাসপাতালের চারপাশে ক্লিনিক

সাজন আহম্মেদ পাপন, কিশোরগঞ্জ 

শহীদ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জে। ছবি: আজকের পত্রিকা

কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের পেছনের ফটক। এই ফটক ঘেঁষে ৯টি এবং ২০০ গজের মধ্যে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক। শুধু জেলা সদরের এই হাসপাতাল নয়, ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনের চিত্র একই। প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আশপাশে রয়েছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক। এতে করে রোগী হাসপাতালের ফটকে পৌঁছানোর আগেই শুরু হয় দালালদের টানাটানি। অনেক ক্ষেত্রে হয়রানির শিকারও হন রোগী ও তাঁর স্বজনেরা।

সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া দালাল চক্রের অপতৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে বলে জুলাইয়ের শেষ দিকে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এরপর থেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের উপজেলাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনেই ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক দেখা গেছে। এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী পাঠানোর জন্য সিন্ডিকেটও দেখা গেছে। কুলিয়ারচর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে এমন একটি ক্লিনিক দেখা গেছে। এ ছাড়া ভৈরব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে ৩টি, পাকুন্দিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশে ৫টি, করিমগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশে ৪টি, কটিয়াদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে ৬টি, নিকলী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে ৪টি, মিঠামইন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে ২টি এবং বাজিতপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে ৩টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া তাড়াইল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকায় দুটি প্রাইভেট হাসপাতাল ও ৭টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং হোসেনপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে ৪টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ১টি ক্লিনিক রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। গ্রাম থেকে কোনো রোগী এলে দালাল চক্রের সদস্যরা বিভিন্নভাবে তাদের কম টাকায় উন্নত চিকিৎসার লোভ দেখিয়ে ক্লিনিকে ভর্তি করিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব দালালের সঙ্গে হাসপাতালের চিকিৎসক জড়িত বলে জানিয়েছেন শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চিকিৎসক। এ ছাড়া নার্সরাও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০১২ অনুযায়ী, কোনো প্রাইভেট ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার হাসপাতালের সীমানার খুব কাছে স্থাপন করা যাবে না। এরপরও কিশোরগঞ্জের প্রতিটি হাসপাতালের সামনে গড়ে উঠেছে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো।

সবচেয়ে বেশি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক রয়েছে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আশপাশে। এর পেছনের গেট ঘেঁষে ৯টি এবং ২০০ গজের মধ্যে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রভাবশালীরা। তাঁদের নিয়োজিত দালালেরা প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সরকারি এই হাসপাতালে আসা রোগীদের বিভ্রান্ত করে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে নিয়ে যায়। এরপর প্যাথলজি পরীক্ষা ও আধুনিক চিকিৎসার নামে তারা বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়।

১৩ আগস্ট কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে আসা রোগীর স্বজন ইয়াছিন বলেন, ‘আমার ভাতিজার রক্তের পরীক্ষার জন্য গেছিলাম। এক লোক এসে বলে, “ভিতরে টেস্ট করলে রিপোর্ট পাইতে তিন দিন লাগবো, বাইরে ১ ঘণ্টায় পাইয়া যাইবেন। বাধ্য হয়ে টেস্ট বাইরে করাতে হলো।’”

এদিকে শহীদ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকের উল্টো পাশেই পাঁচটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। সেগুলোর সামনে রয়েছে ঝলমলে সাইনবোর্ড আর হাঁকডাক চলছে দালালদের। এই হাসপাতালের শুরু থেকে সেবা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে রোগী ও স্বজনদের। অভিযোগ, গুরুতর ও জটিল রোগে আক্রান্তদের হাসপাতালে আসতে নিরুৎসাহিত করা হয়। সময়মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পাওয়া যায় না। চিকিৎসকেরা রোগী ঠিকমতো না দেখেই অন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেন। পরীক্ষার জন্য টিকিট কাউন্টারে গেলে সেখানকার কর্মীরাও পাশের ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

তবে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্যাথলজি ও রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের ইনচার্জ মিজবাহ উদ্দিন আহমদ নিঝুম বলেন, হাসপাতালের আউটডোর প্যাথলজি বিভাগ সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এবং ইনডোরের জরুরি সেবা ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। সেই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রয়েছে রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগ (ব্লাড ব্যাংক)।

তবে ১৩ আগস্ট শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসা রোগী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘টিকিট কাউন্টার থেকে শুরু করে বাইরে পর্যন্ত দালালের চক্র। ওদের ডায়াগনস্টিকে না গেলে ডাক্তার ওষুধ দেবেন না—এই ভয় দেখিয়ে রোগীদের পকেট কাটা হচ্ছে।’

মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতাল গেটের সামনের ডায়াগনস্টিক সেন্টার সরিয়ে নিতে আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছি।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন নাজমুল আলম বলেন, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রণীত চেকলিস্ট অনুযায়ী সিভিল সার্জন পরিদর্শনপূর্বক পরিদর্শন রিপোর্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠান। সেই চেকলিস্টে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের দূরত্ববিষয়ক কোনো নির্দেশনা নেই। এ ছাড়া বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের ক্ষেত্রে পরিবেশ ছাড়পত্র এবং ড্রাগ ও নারকোটিক-বিষয়ক ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। সর্বোপরি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।