হোম > সারা দেশ > কিশোরগঞ্জ

সালিস না মানায় একঘরে ২০ সদস্যের পরিবার, কথা বললেও জরিমানা ১০ হাজার

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি

বেলভিডা দক্ষিণ সাতুঢা গ্রামের ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে গ্রাম্য সালিস না মানায় ২০ সদস্যের একটি পরিবারকে ২৩ দিন ধরে একঘরে করে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরিবারটির অভিযোগ, তাঁদের সঙ্গে আশপাশের কেউ কথা বললে, তাঁদের অটোরিকশায় চড়লে কিংবা আয়-রোজগারের কাজে সহযোগিতা করলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ওই সালিসে।

উপজেলার হিলচিয়া ইউনিয়নের বেলভিডা দক্ষিণ সাতুঢা গ্রামের ভুক্তভোগী ওই পরিবারের সদস্যরা প্রভাবশালী সালিসকারীদের রোষানলে পড়ে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মৃত ভেলু মিয়ার ছেলে হবি মিয়া ও রফিক মিয়ার এই পরিবার একঘরে মুক্তির দাবি জানিয়েছে।

‎ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, তাঁদের প্রায় দেড় শতাংশ জমি নিয়ে প্রতিবেশী সেলিম ও শাহিনের সঙ্গে বিরোধ চলে আসছিল। সেলিম ও শাহিনের দাবি, তাঁরা ওই জমি অনেক আগে কিছু টাকার বিনিময়ে কিনেছেন। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তাঁরা জমিটি বিক্রি করেননি এবং এ বাবদ কোনো টাকাও নেননি।

‎এ বিরোধকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিস বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ সালিসে ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি হাজী ফারুকের সভাপতিত্বে বৈঠক হয়। সেখানে গ্রামের দরবারি কদু মিয়া, মন্নার, নঙ্গু মিয়া, ইউনিয়ন বিএনপির ৭ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি আবিরাজ, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস, হিলচিয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রিপন মিয়া, বিভু ও মানিকসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।

সেখানে সেলিম ও শাহিন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সালিসকারীরা সিদ্ধান্ত নেন, সেলিম ও শাহিন দেড় লাখ টাকা দেবেন হবি ও রফিক মিয়াকে। বিনিময়ে তাঁরা দেড় শতাংশ জমি ছেড়ে দেবেন। তবে এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান হবি ও রফিক মিয়া।

‎তাঁদের অভিযোগ, সালিসের সিদ্ধান্ত না মানায় সামাজিকভাবে তাঁদের বয়কটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গ্রামের লোকজনকে তাঁদের সঙ্গে কথা বলা, সামাজিক যোগাযোগ রাখা এবং তাঁদের আয়-রোজগারের কাজে সহযোগিতা না করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।

‎ভুক্তভোগী হবি মিয়া বলেন, ‘গ্রামে আমার একটি ধান ভাঙানোর চালকল রয়েছে। সেখানে এলাকার কেউ ধান বা চাল ভাঙাতে গেলে তাঁকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে আমার ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আমি খুব সমস্যার মধ্যে আছি।’

হবির ছোট ভাই রফিক মিয়া বলেন, ‘আমার অটোরিকশায় কেউ উঠলে তাঁকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এমনকি আমি কারও অটোরিকশায় ওঠালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ১০ হাজার টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে। আমি গরিব মানুষ। অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাই। আমি পরিবার নিয়ে এখন কীভাবে চলব?’

এরই মধ্যে সালিসকারীদের নির্দেশে ভুক্তভোগী পরিবারের একটি খড়ের গাদা প্রতিবেশী দিলোয়ার হোসেন ভেঙে দিয়েছেন। ‎দিলোয়ার হোসেনের দাবি, সালিসকারীদের নির্দেশেই তিনি খড়ের গাদাটি ভেঙেছেন। যদিও খড়ের গাদার জায়গাটি নিজের বলে দাবি করেছেন দিলোয়ার। তবে এ দাবির বিরোধিতা করে হবি মিয়া বলেন, ‘জায়গাটি রেকর্ডের রাস্তার।’

এদিকে পরিবারটিকে একঘরে করার সিদ্ধান্তের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হিলচিয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রিপন মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা তাঁদের একঘরে করিনি। তাঁদের সঙ্গে আমরা কথা বলি না, তাঁদের অটোরিকশায় উঠি না।’ তবে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন।

‎সালিসে উপস্থিত অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

‎জমি নিয়ে বিরোধের অপর পক্ষ সেলিম ও শাহিনের বক্তব্য জানতে বাড়িতে গিয়েও তাঁদের পাওয়া যায়নি।

‎এ বিষয়ে হিলচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাজফারুল ইসলাম নাহিদ বলেন, আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। তবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি দেখব।

বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জালাল উদ্দীনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।