কিশোরগঞ্জের ভৈরব ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ অংশের মেঘনা নদীতে সরকারি পাইপলাইন ও তেলবাহী জাহাজ থেকে রাতের বেলা জ্বালানি তেল (কনডেনসেট) চুরি ও পাচারের অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ কর্মকাণ্ডে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, আশুগঞ্জ প্রান্তে কনডেনসেট হ্যান্ডলিং স্থাপনা থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাহাজে তেল লোডের সময় ও জাহাজ নদীতে অবস্থানকালে সংঘবদ্ধ একটি চক্র বিভিন্ন কৌশলে কনডেনসেট সংগ্রহ করে পাচার করছে। চক্রটি নৌ পুলিশ, আশুগঞ্জ প্রশাসনের কয়েকজন ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও কিছু সাংবাদিককে মাসোহারা দিয়ে প্রতি মাসে অর্ধকোটি টাকার বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পাচার করছে।
সাধারণত, পেট্রোবাংলার অধীনস্থ রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) আশুগঞ্জ কনডেনসেট হ্যান্ডলিং স্থাপনা থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেলবাহী জাহাজে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল লোড করা হয়। পরে এসব জাহাজ চট্টগ্রামে নিয়ে গিয়ে তেল পরিশোধন করা হয়। চোর চক্র গভীর রাতে স্টিলের নৌকার মাধ্যমে পাইপলাইন ও জাহাজ থেকে ড্রাম ভর্তি করে কনডেনসেট সংগ্রহ করে। পরে নদীপথে সেগুলো ভৈরব বাজারের বিভিন্ন ঘাট দিয়ে খালাস করে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব অপরিশোধিত কনডেনসেট পরে ভৈরবসহ কিশোরগঞ্জ, কটিয়াদী, নেত্রকোনা, নরসিংদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।
প্রতি সপ্তাহে আনুমানিক ৭৫ ড্রাম এবং মাসে ৩০০ ড্রাম কনডেনসেট চুরি ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে খোরশেদ মিয়ার নেতৃত্বাধীন চক্রের বিরুদ্ধে। সে হিসাবে প্রতি মাসে প্রায় ৬০ হাজার লিটার কনডেনসেট পাচার করেন তিনি। খোলাবাজারে এর বিক্রয়মূল্য প্রতি লিটার ১১০ টাকা হিসাবে প্রায় ৬৬ লাখ টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের আমলে কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার ছত্রচ্ছায়ায় সরকারি কনডেনসেট চুরি ও পাচার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন সোহরাফ হোসেন নামের এক ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পরিবর্তনের পর ওই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ ভৈরবের পাশের রায়পুরা উপজেলার গৌরিপুর এলাকার খোরশেদ মিয়ার হাতে যায়। খোরশেদ মিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন চক্রে রুবেল মিয়া, আলামিন মিয়া, নিয়ামত মিয়াসহ আরও কয়েকজন জড়িত রয়েছেন।
অভিযুক্ত চক্রের সদস্য রুবেল মিয়া বলেন, ‘আমি ও আলামিন ভাই খোরশেদ ভাইয়ের অধীনে কাজ করি। খোরশেদ ভাইয়ের মাল আমরাই তদারকি করি। নদী থেকে এনে বিভিন্ন তেলের ঘরে পৌঁছে দিই। ১১০ টাকা লিটারে কনডেনসেট তেল আমরা বিক্রি করি। এটা অনেক ভারী তেল, খনির তেল। যারা আমাদের কাছ থেকে নেয়, তারা অন্য তেলের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করে। কিন্তু মানুষ মনে করে এটা চুরি, আসলে চুরি না। জাহাজে ১৪টি হোস্ট পাইপ থাকে। তেল লোডের পর হোস্ট পাইপগুলো আমাদের লোকেরা টেনে তোলার সময় তেল আমরা নৌকায় ফিমা দিয়ে নিয়ে আসি। পরে ড্রামে লোড করি। সেটার জন্য জাহাজের কাউকে টাকা দিতে হয় না। খোরশেদ ভাইয়ের নৌকা দিয়ে জাহাজের বিভিন্ন কাজকর্ম করে দিই, এর জন্য জাহাজ থেকে বেতনও দেয় না। সবাই এইটারে অবৈধ বানাইয়া ফেলছে।’
অভিযুক্ত আলামিন মিয়ার বক্তব্য, ‘বৈধভাবে পে-অর্ডারের মাধ্যমে মেঘনা ডিপো থেকে তেল সংগ্রহ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করি আমরা। আমরা কোনো চোরাই তেল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নই। নিয়ম অনুযায়ী ডিপো থেকে খোরশেদ ভাইয়ের তেল সংগ্রহ করছি।’
তবে তেল পাচার চক্রের মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত খোরশেদ মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
ভৈরব পৌর যুবদলের সভাপতি মো. হানিফ মাহমুদ বলেন, ‘এই নির্বাচনের আগে খোরশেদ মিয়ার নেতৃত্বে তেল পাচার চক্রটি নৌকায় করে জগন্নাথপুরে তেল খালাস করত। অবৈধ কার্যক্রমে আমরা যুবদলের নেতা-কর্মী নিয়ে ধাওয়া দিলে তারা পালিয়ে যায়।’
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সরকারি জ্বালানি তেলের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তাকর্মী এবং তেলবাহী জাহাজের দায়িত্বে থাকা লোকজনের যোগসাজশ ছাড়া পাইপলাইন ও জাহাজ থেকে নিয়মিত তেল পাচার সম্ভব নয়। তারা কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন, নৌ পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। অভিযোগের সত্যতা মিললে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও স্থায়ী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলারও দাবি জানিয়েছে তারা।
ভৈরব নৌ পুলিশের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর মনিরুজ্জামান বলেন, ‘যদি সরকারি তেল চুরি হয়, কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করলে আমরা সেটা দেখব। তেল কর্তৃপক্ষ মামলা করুক, নইলে এসকর্ট করার জন্য এসপি স্যারকে চিঠি দিলে এসপি স্যার আমাদের নির্দেশনা দিলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
নৌ পুলিশ কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের পুলিশ সুপার কে এম আরিফুল হক বলেন, ‘নদীতে তেল পাচারের বিষয়টি আমার জানা নেই। জানলে তো আইনানুগ ব্যবস্থা নিতাম, যদি আমার এরিয়া বা এখতিয়ারের মধ্যে হয়।’
আশুগঞ্জ কনডেনসেট হ্যান্ডলিং স্থাপনার উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) প্রকৌশলী এ কে এম রকিবুল ইসলাম মোবাইল ফোনে বলেন, জাহাজের চাহিদা অনুযায়ী কনডেনসেট সরবরাহ করা হয় এবং পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও গণনা করা হয়। পাইপলাইন থেকে তেল পাচারের সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, জাহাজ থেকে কেউ তেল চুরি করে থাকলে সেটি ভিন্ন বিষয়। বিগত সরকারের আমলে একটি চক্র হোস্ট পাইপ ছিদ্র করে কিছু কনডেনসেট সরিয়ে নিত। এটা কর্তৃপক্ষ অবগত হওয়ায় সিকিউরিটি জোরদার করে। চারটি কোম্পানি এখান থেকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী কনডেনসেট নেয়। তেলবাহী জাহাজের লোকজনের যোগসাজশে পাচার হতে পারে। সেটা সরকারি সম্পত্তি (কনডেনসেট) পাচার বলা যাবে না।’