হোম > সারা দেশ > খুলনা

তিন মাস পর মঙ্গলবার খুলছে সুন্দরবন, স্বস্তির সঙ্গে আছে দস্যু-আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা 

ছবি: সংগৃহীত

টানা তিন মাসের আইনি নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামীকাল মঙ্গলবার খুলে দেওয়া হচ্ছে সুন্দরবন। এ দিন দুই বিদেশি পর্যটকসহ তিন শতাধিক পর্যটক নিয়ে সাতটি জাহাজ সুন্দরবনে যাবে। এর আগে আজ সোমবার রাত ১২টার পরপরই বনে প্রবেশ করবেন শত শত বনজীবী।

দীর্ঘদিন পর বন খোলার খবরে উপকূলের মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও আনন্দের পাশাপাশি তাঁদের তাড়া করছে মহাজনের ঋণের বোঝা ও দস্যু-আতঙ্ক। যদিও বনে পর্যটক ও বনজীবীদের নিরাপত্তায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোসহ কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড ও র‍্যাব-৬।

জানা গেছে, সুন্দরবনে প্রজনন মৌসুমে মাছ ও বন্য প্রাণীর নির্বিঘ্ন বিচরণ নিশ্চিত করতে গত ১ জুন থেকে আজ পর্যন্ত সব ধরনের প্রবেশাধিকার বন্ধ রেখেছিল বন বিভাগ। এ সময় আয়রোজগার বন্ধ হয়ে বনজীবী ও জেলেদের মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। অনেক জেলে-বাওয়ালিকে মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন কিংবা এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। আগামীকাল থেকে বনে পুরোদমে মাছ ধরা ও পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হবে। এ লক্ষ্যে জেলে ও বনজীবীরা নৌকা-ট্রলার নিয়ে বনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন।

জানতে চাইলে ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) সেক্রেটারি মাজহারুল ইসলাম কচি জানান, আগামীকাল সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগের আওতায় সাতটি জাহাজ তিন শতাধিক পর্যটক নিয়ে সুন্দরবনে যাবে। এর মধ্যে দুজন বিদেশি পর্যটক রয়েছেন।

কচি বলেন, ‘সুন্দরবনে তিন মাস প্রবেশ নিষেধাজ্ঞায় সুন্দরবনের তেমন কোনো লাভ হয়নি, পর্যটন বন্ধ থাকায় আমাদের প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ধারদেনা ও ব্যাংকের ঋণ করে বেকার হয়ে পড়া দেড় হাজারের বেশি গরিব পর্যটনশ্রমিককে পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। এখন সুন্দরবন খুলে দেওয়া হলেও তাতে পর্যটন ব্যবসায়ীদের তেমন একটি লাভ হবে না। কারণ, এখন পর্যটনের মৌসুম নয়।’

শরণখোলার দক্ষিণ রাজাপুর এলাকার সাউথখালী গ্রামের আবদুল খালেক ও জাহিদুল হাওলাদার, সোনাতলা গ্রামের আবদুর রহিমসহ অনেক জেলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিন মাস মাছ ধরতে না পেরে অর্থকষ্টে অনেক পরিবারের অর্ধাহারে দিন কেটেছে। এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা সংগ্রহ করায় তাঁদের ঋণের বোঝা বেড়েছে। আজ রাত ১২টার পর বনে যেতে নৌকা ও ট্রলারে জাল ও খাদ্যসামগ্রী বোঝাইসহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছেন তাঁরা।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের আওতাধীন শ্যামনগরের দাতিনখালী এলাকার জেলে জাহাঙ্গীর সানা বলেন, তিন মাস মাছ-কাঁকড়া আহরণ বন্ধ থাকায় চরম কষ্টে দিন কেটেছে জেলে-বাওয়ালিদের। অনেককে সুদে টাকা নিয়ে সংসার চালাতে হয়েছে। এখন আবার সুদে টাকা নিয়েই নৌকা ও জাল মেরামত করছি। আগামীকাল থেকে বনে গিয়ে মাছ-কাঁকড়া ধরে ঋণ শোধের পাশাপাশি পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

তবে জাহাঙ্গীর শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সুন্দরবনে কয়েকটি বনদস্যু দল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বনে ঢুকলে তাদের নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে হয়। যে টাকা আয় করব, তা দিয়ে ঋণশোধ করব নাকি বনদস্যুদের চাঁদা দেব, আল্লাহ জানে।’

মুন্সিগঞ্জের পর্যটকবাহী ট্রলারমালিক নূর ইসলাম বলেন, ‘তিন মাস ট্রলার বসে থাকায় ট্রলারের ক্ষতি হয়েছে। এখন সংস্কার করতে সমিতি থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। পাস ছাড়ার পর যা আয় করব, তা দিয়ে সমিতির ঋণের টাকা শোধ করে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে।’

বুড়িগোয়ালিনী এলাকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘তিন মাস সংসার চালাতে গিয়ে ৫০ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে। এখন থেকে বনে গিয়ে কামাই করে ঋণ শোধ করব। কিন্তু বনদস্যুদের চাঁদা দিতে গেলে ঋণ শোধ হবে না।’

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের কটকা অভয়ারণ্য কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্টার তানভির হাসান ইমরান ও হাড়বাড়িয়া ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্টার মো. রবিউল ইসলাম জানান, পর্যটকদের বরণ করে নিতে প্রস্তুত রয়েছে কটকা ও হাড়বাড়িয়া পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটকদের সুবিধার জন্য নতুন জেটিঘাটও নির্মাণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর্যটন বন্ধ থাকায় কটকা ও হাড়বাড়িয়ায় বন্য প্রাণীর আনাগোনা বেড়েছে। এখন নানা জাতের পাখির ডাকে মুখরিত সুন্দরবন।

সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিয়ে জানতে চাইলে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার বিএন সাব্বির আলম সুজন বলেন, সুন্দরবনে সক্রিয় দস্যু বাহিনীর কার্যক্রমের ওপর কোস্ট গার্ডের নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দস্যুদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

সাব্বির আলম সুজন আরও বলেন, সুন্দরবন অঞ্চলে সক্রিয় সব বনদস্যু বাহিনী নির্মূল এবং উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ জেলে, বাওয়ালি, মৌওয়ালি ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

জানতে চাইলে র‍্যাব-৬-এর অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ বলেন, সুন্দরবনকে সম্পূর্ণরূপে দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। ইতিমধ্যে সুন্দরবনের একটি বাহিনীর ৫০ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন।

বন সংরক্ষক (খুলনা অঞ্চল) ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবনে প্রবেশে আগে যাঁদের পাস দেওয়া হয়েছিল, তাঁরাই বনে যেতে পারবেন। তবে নতুন করে পাস পারমিট সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগ থেকে দেওয়া হবে। এ ছাড়া নিরাপত্তায় বন বিভাগকে সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে র‍্যাব ও কোস্ট গার্ড।