ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) আন্তঃবিভাগ ও আন্তঃহল ফুটবল টুর্নামেন্টের খেলাকে কেন্দ্র করে একই দিনে দুই দফায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে বিভিন্ন বিভাগের অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
আজ সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ফুটবল মাঠে পৃথক দুটি ম্যাচকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফুটবল টুর্নামেন্ট স্থগিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আজ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন টুর্নামেন্টের আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন।
জানা যায়, এদিন বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারামারি হয়। পরে বিকেল ৩টায় ফার্মেসি ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের মধ্যকার ম্যাচে শেষ মুহূর্তে বল থ্রো-ইন হলে বল আনতে যান হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মশিউর। এ সময় দর্শক সারিতে থাকা ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থীরা বল দিতে সময়ক্ষেপণ করায় মশিউরের সঙ্গে তাঁদের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে উভয় পক্ষ লাঠিসোঁটা নিয়ে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন।
এদিকে ফার্মেসি ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মধ্যকার ম্যাচে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গোলরক্ষককে ফার্মেসি বিভাগের দর্শকেরা স্লেজিং করতে থাকেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
দুই ঘটনায় আহত শিক্ষার্থীরা হলেন—ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২২–২৩ শিক্ষাবর্ষের হুমায়ুন কবির, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের মশিউর, আলিফ খান, আলিফ রাহাত, তোফাজ্জল ও একই বিভাগের ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের রায়হান, ফার্মেসি বিভাগের ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের তৌহিদ ও ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের বাঁধন এবং বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের প্রত্যয়। আহতদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেলে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে আলিফ খানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, খেলার শেষ মুহূর্তে বল থ্রো-ইন হওয়ায় মশিউর বল আনতে যান। এ সময় ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীরা সময়ক্ষেপণের জন্য বলটি দূরে ফেলে দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীরা মশিউরকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। পরে তাঁরা লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁদের ওপর হামলা করেন।
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বলটি থ্রো-ইন হওয়ার পর তারা বল দিতে গেলে সামনে থাকা অন্য একজনের পায়ে লেগে সেটি কিছুটা দূরে চলে যায়। তবে খুব বেশি দূরে যায়নি। এ সময় মশিউর বলতে থাকেন, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বলটি দূরে ফেলে দিয়েছেন। পরে মশিউরের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের শিক্ষার্থীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে তেড়ে এসে তাদের মারধর করেন।
এ বিষয়ে আহত ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বল নিয়ে কথা-কাটাকাটি হওয়ার পর একজন আমাকে পেছন থেকে ধরে উল্টে ফেলে দেন। এরপর অন্যরা আমাকে এলোপাতাড়ি মাথায়-মুখে লাথি মারতে থাকেন। এতে আমার মুখ ও দাঁত ফেটে গেছে।’
ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীরা তাদের গোলরক্ষককে স্লেজিং করেন। তারা নিষেধ করলে আমরা বলি, স্লেজিং খেলার অংশ। এরপর তারা আমাদের এক জুনিয়রকে ধাক্কা দেন। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের তৌফিক বলেন, ‘ফার্মেসি বিভাগের খেলোয়াড়েরা স্লেজিং করতে করতে একপর্যায়ে গালাগালি শুরু করেন। আমাদের সিনিয়রেরা তাদের স্লেজিং সীমিত করতে বললে তারা আমাদের এক সিনিয়র রফিক ভাইকে ধাক্কা দেন এবং প্রত্যয়কে এলোপাতাড়ি মারধর করেন।’
বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের আহত শিক্ষার্থী প্রত্যয় বলেন, ‘আমাকে একসঙ্গে ৫০ জন শিক্ষার্থী মারধর করেছে। শারীরিক অবস্থার কারণে কিছু বলতে পারছি না।’
এ বিষয়ে দায়িত্বরত ডা. বদিউজ্জামান বলেন, ‘আহত অবস্থায় কয়েকজন শিক্ষার্থী মেডিকেলে আসে। তিনজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছে। বাকি দুজনের মধ্যে একজনের মাথা কেটে গেছে এবং আরেকজনের ঠোঁট কেটে যাওয়া ও দাঁতে আঘাত পাওয়ায় সেলাই দেওয়া হচ্ছে।’
এ বিষয়ে ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার জাকিয়া আক্তার বলেন, ‘আহত প্রত্যয়কে দেখে গুরুতর কিছু মনে হয়নি। তবে সে আতঙ্কিত হওয়ায় তাকে কুষ্টিয়া মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, ‘সার্বিক বিষয়ে উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে আন্তঃবিভাগ ও আন্তঃহল ফুটবল টুর্নামেন্টের আহ্বায়ক ও উপউপাচার্য অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন বলেন, ‘অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্য আপাতত পুরো টুর্নামেন্টের খেলা স্থগিত রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেব।’