খুলনায় ৯ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা চার দিনের ভারী বৃষ্টিতে মৎস্য ও কৃষি খাতে অন্তত ১৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মৎস্য খাতেই প্রায় ১২৬ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া কৃষিতে ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে এ তথ্য পাওয়া গেছে। মৎস্য খাতে মোট ক্ষতির প্রায় ৭০ শতাংশই হয়েছে চিংড়িচাষিদের। এ ছাড়া কৃষিতে তরমুজচাষিরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
খুলনা বিভাগের মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, চার দিনের ভারী বৃষ্টিপাতে বিভাগের ১০টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরও জানান, ওই বিভাগে ৪ হাজার ৭৬৪টি পুকুর এবং ২ হাজার ৮০৮টি দিঘি ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি জানান, সাদা মাছচাষিরা ৭৩ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ ছাড়া চিংড়ি খাতে ১৫ কোটি, মাছের পোনা খাতে ৯ কোটি এবং কাঁকড়া ও কুঁচিয়া খাতে ২৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। দেশের অন্যতম প্রধান চিংড়ি চাষের কেন্দ্রস্থল ডুমুরিয়া এলাকাটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে প্রায় ৬৫০টি মৎস্য ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
বাঁধ ও মাছ চাষের অবকাঠামোসহ বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ছয় কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবিরাম বৃষ্টিপাত ও নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়াকে এই ক্ষতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন খুলনা বিভাগের মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম।
পুরস্কারপ্রাপ্ত চিংড়িচাষি মাহতাব হোসেন বলেন, চিংড়ি চাষ মৌসুমের শুরুতেই এমন প্রবল বৃষ্টিপাতের কথা চাষিরা আগে ধারণা করতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা সবেমাত্র চিংড়ির পোনা ছাড়তে শুরু করেছি এবং এই উৎপাদন প্রক্রিয়া আরও ছয় মাস চলবে। এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে সময় লাগবে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খুলনা জেলায় ফসলের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খুলনা অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, এতে ৭ হাজার ৭৩৬ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং প্রায় ১৮০ দশমিক ৩ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তরমুজচাষিরা। তাঁদের ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অন্যদিকে, ধান ও সবজি চাষে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকা।
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জমি থেকে দ্রুত পানি নেমে যাওয়ায় কৃষকেরা খুব শিগগির এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবেন। পাশাপাশি কৃষকেরা আমন ধানের বিশাল আকারের বীজতলা প্রস্তুত রেখেছিলেন এবং বিএডিসির ১০০ টন বীজও মজুত ছিল।
তেলিগাটি মৌজার অন্তর্গত বিল ডাকাতিয়ার মৎস্য ঘেরের মালিক মমরোজ আলী জানান, বৃষ্টির পানি উপচে পড়ার কারণে বিল ডাকাতিয়ার মৎস্যচাষিরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি জানান, ৬৫ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত তাঁর তিনটি মৎস্য খামারের মধ্যে দুটিই তলিয়ে গেছে। অতিরিক্ত পানির তোড়ে ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। মমরোজ আলী বলেন, ‘সরকার যদি আমাদের প্রণোদনা দেয়, তবে আমরা এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব।’ ডুমুরিয়া উপজেলার টিপনা গ্রামের আব্দুল মতিন, আমানুল্লাহ ও জলিল মোল্লা জানিয়েছেন, বৃষ্টির পানি নামতে শুরু করায় মৌসুমি সবজি চাষের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং তাঁরা এখন বীজতলা তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।