স্বপ্ন ছিল ক্রিকেটার হওয়ার। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার বড়বিল এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহজাহানের। নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন এবার ছেলের চোখে বুনেছেন তিনি। মাত্র চার বছর বয়সে ছেলে মোহাম্মদ সাইফের হাতে তুলে দেন ব্যাট ও বল। সেই থেকে শুরু। প্রত্যন্ত জনপদ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ছেলেকে নিয়মিত ক্রিকেট প্রশিক্ষণে নিয়ে গেছেন তিনি। বাবার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা আর ছেলের প্রতিভায় এবার যেন স্বপ্নপূরণের নতুন দুয়ার খুলেছে।
গত ১৫ অক্টোবর চট্টগ্রামের সাগরিকা স্টেডিয়ামে রবি হান্টের উদ্যোগে আয়োজিত বিভাগীয় পর্যায়ের বাছাইপর্বে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পেয়েছে নয় বছর বয়সী সাইফ। বিভাগীয় পর্যায়ে নির্বাচিত নয়জনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করে সে।
আজ রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে মানিকছড়ি উপজেলার প্রত্যন্ত ও অনগ্রসর জনপদ বড়বিলে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির উঠানে ছেলেকে নিয়ে ব্যাট-বলের অনুশীলনে ব্যস্ত শাহজাহান। বিদ্যুৎবিহীন এই জনপদে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও ছেলেকে ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তুলতে তাঁদের প্রচেষ্টা থেমে নেই।
সাইফের স্বপ্ন, একদিন বড় ক্রিকেটার হবে। বাবার হাত ধরেই ক্রিকেটের সঙ্গে তার পরিচয়। ছোটবেলা থেকেই বাবার ইশারা ও সংকেত অনুসরণ করে ক্রিকেটের প্রাথমিক পাঠ নেওয়া শুরু করে সে।
সাইফ জানায়, চার বছর বয়সে বাবা তার হাতে ব্যাট ও বল তুলে দেন। এরপর থেকে একজন প্রশিক্ষকের মতো করে তাকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন বাবা। তাদের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উপজেলা পেরিয়ে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের খাগড়াছড়ি জেলা সদরের ক্রিকেট একাডেমিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়া ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। তবু বাবা তাকে নির্ধারিত দিনে প্রশিক্ষণে নিয়ে যেতেন।
দুই সন্তানের জনক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ক্রিকেট আমার প্রিয় খেলা। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটার হওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। প্রথম সন্তান জন্ম নেওয়ার পর নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের কথা ভাবতে শুরু করি। ছেলের হাতে বই-কলম তুলে দেওয়ার আগেই ব্যাট ও বল তুলে দিয়েছিলাম।
তিনি বলেন, আমাদের উপজেলায় উপযুক্ত ক্রিকেট ক্লাব না পেয়ে ছেলেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের ক্রিকেট একাডেমিতে নিয়ে যেতাম। নির্ধারিত দিনে নিয়মিত প্রশিক্ষণ করিয়েছি। জেলা পর্যায়ে বিকেএসপির বাছাইপর্বে সে নির্বাচিত হয়েছিল। কিন্তু বয়স কম হওয়ায় তখন জাতীয় পর্যায়ে খেলার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে এবার রবি হান্টের বাছাইপর্বে উত্তীর্ণ হয়ে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পেয়েছে সে।
শাহজাহান আরও বলেন, গত ১৫ অক্টোবর চট্টগ্রামে রবি হান্টের আয়োজনে কয়েক হাজার ক্রিকেটপ্রেমীর অংশগ্রহণে বাছাইপর্ব অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সাইফ স্বাভাবিক ও সাবলীল খেলা প্রদর্শন করে বিভাগীয় পর্যায়ের নির্বাচিত নয়জনের মধ্যে জায়গা করে নেয়। তাদের মধ্যে সে সবচেয়ে ছোট। এর মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতার সুযোগ পেয়েছে সাইফ।
ছেলের এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত শাহজাহান বলেন, আল্লাহ আমার লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ সুগম করেছেন। আশা করি, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও উন্নত প্রশিক্ষণ পেলে আমার সাইফ বহুদূর এগিয়ে যাবে, ইনশা আল্লাহ।