হোম > সারা দেশ > খাগড়াছড়ি

পাহাড়ে কমছে জুমচাষ, বাড়ছে ফলের বাগান

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি 

জুমের পাকা ধান কাটতে ব্যস্ত ত্রিপুরা নারীরা। গত শনিবার খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার নতুনপাড়া এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

খাগড়াছড়ির সবুজ পাহাড়ে মৃদু বাতাসে দোল খাচ্ছে জুমের সোনালি ধান। পাকা ধান কাটতে ব্যস্ত ত্রিপুরা নারীরা। গত শনিবার বিকেলে জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার নতুনপাড়া এলাকায় এই দৃশ্য চোখে পড়ে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা, খাবার, সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে জুমচাষ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম জুমচাষ করে চলেছেন তাঁরা। পাহাড়ে জুমের ফলন এখনো ভালো হলেও প্রতিবছর কমছে জুমচাষের পরিমাণ। বিভিন্ন ফল ও সেগুনবাগান সম্প্রসারণ এবং জুমের জমি কমে যাওয়া, মাটির উর্বরতা শক্তি কমাসহ নানা কারণে প্রাচীন এই চাষাবাদ থেকে সরে যাচ্ছেন চাষিরা।

জুমচাষ একধরনের কৃষিপদ্ধতি। পাহাড়ের গায়ে ঢালু এলাকায় এই চাষ করা হয়। পাহাড়ের এই ঐতিহ্যবাহী চাষপদ্ধতিতে ধান, আদা, হলুদ, ভুট্টা, মারফা, মিষ্টিকুমড়া, তিল, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করে পাহাড়ের মানুষ। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে পাহাড়ের ঢালে জুমের জমিতে বিভিন্ন ফসলের বীজ বপন করেন চাষিরা। তিন-চার মাস পর আশ্বিনের শুরুতে ধান পাকতে শুরু করে। মাসের শেষ দিকে শুরু হয় পাকা ধান ঘরে তোলার উৎসব, যা চলে প্রায় মাসজুড়ে।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ হাজার ১৫০ হেক্টরে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। অর্থাৎ এক অর্থবছরে ১০ হেক্টর জমিতে জুমচাষ কমেছে।

দীঘিনালা উপজেলার সীমানাপাড়া এলাকার কার্বারি চয়ন ত্রিপুরা বলেন, ‘আগে আমাদের দুর্গম এলাকায় অনেকে জুমচাষ করতেন। এখন বিভিন্ন ফলের বাগান, সেগুনবাগান ও বসতবাড়ি হয়েছে। ফলে জুমচাষের জায়গা কমেছে। সামনে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে।’

মাটিরাঙ্গা উপজেলার দুর্গম হাচুকপাড়া এলাকার জুমচাষি দুলাল ত্রিপুরা, বিক্রম ত্রিপুরা ও অগ্নিলাল ত্রিপুরা জানান, মাটির উর্বরতা শক্তি নেই। প্রতিবছর এক জায়গায় চাষ করি। আগের মতো ফলন হয় না। এখন জুমে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে। অথচ একসময় এসবের প্রয়োজন ছিল না।

দীঘিনালার নয়মাইল এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য গণেশ ত্রিপুরা বলেন, প্রতিবছর জুমচাষ কমছে। ফলের বাগান বাড়াই এর কারণ। জুমচাষিরা সরকারি কৃষিঋণও পান না। সরকার ঋণসহায়তা দিলে চাষিরা অনেক উৎসাহিত হতেন।

মাটিরাঙ্গা উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য (মেম্বার) শান্তিময় ত্রিপুরা বলেন, ‘খাগড়াছড়ির মধ্যে মাটিরাঙ্গা উপজেলার আলুটিলা হৃদয় মেম্বারপাড়া এলাকায় সবচেয়ে বেশি জুমচাষ হয়। এখানে দেখা গেছে, এক হাজার পরিবারের মধ্যে অন্তত তিন শ পরিবার জুমচাষ করেছে। মাটির আর্দ্রতা কমে গেছে, তাই ফলন কম হয়। এ ছাড়া জুমের জায়গায় আম, সেগুনবাগানসহ বিভিন্ন বাগান হওয়ায় জুমচাষ করার জায়গা নেই। দুর্গম এলাকায় যাঁরা জুমচাষের ওপর নির্ভর করেন, তাঁরা চাষ করতে না পারলে খাদ্যসংকটে পড়বেন। আমি মনে করি, জুমচাষিদের প্রতি সরকার সুদৃষ্টি দিলে জুমচাষের প্রতি আগ্রহ বাড়বে।

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, জেলায় কয়েক বছর ধরে জুমচাষ ধারাবাহিকভাবে কমছে। কৃষি বিভাগ বিভিন্নভাবে চাষিদের সহায়তা দিয়ে জুমচাষে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছে।