‘বাবা গরিব। চাইলেও স্বামীর চাওয়া টাকা দিতে পারেননি। এ জন্যই কি আমার গায়ে গরম পানি ছুড়ে মারা হলো?’—জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাবেকুন নাহারের (২৫) কণ্ঠে এমনই আকুতি। শরীরের যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে হাসপাতালের বিছানায় দিন কাটছে তাঁর। পাশে সাড়ে তিন মাসের শিশুসন্তান।
সাবেকুন নাহারের অভিযোগ, যৌতুকের দাবিকৃত টাকা না পেয়ে তাঁর স্বামী ও শ্বশুর যৌথভাবে তাঁকে দগ্ধ করেছেন। গত পাঁচ দিন ধরে তিনি জয়পুরহাট ৪০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সাবেকুন জয়পুরহাট সদর উপজেলার কাদোয়া কয়রাপাড়া গ্রামের মোশাররফ হোসেনের মেয়ে। প্রায় দুই বছর আগে পাঁচবিবি উপজেলার খাসবাট্টা তৈফিকপাড়া গ্রামের আলেফ উদ্দীনের ছেলে সাজু মিয়ার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের ঘরে সাড়ে তিন মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সাবেকুন আক্ষেপ করে বলেন, ‘বিয়ের সময় বাবা আড়াই লাখ টাকা যৌতুক দিয়েছিলেন। এখন আবার টাকা চাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু আমার বাবা গরিব মানুষ, এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য তাঁর নেই। টাকা দিতে না পারার কষ্ট তো ছিলই, তার ওপর আমার গায়ে গরম পানি বা কী যেন ছুড়ে দেওয়া হলো। আমি শুধু চাই, আমার ছোট সন্তানটাকে নিয়ে যেন বাঁচতে পারি।’
সাবেকুনের বাবা মোশাররফ হোসেন জানান, গত ২৫ সেপ্টেম্বর পারিবারিক কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে মেয়ের স্বামী ও শ্বশুর তাঁর গায়ে গরম পানি বা দাহ্য পদার্থ নিক্ষেপ করেন। মেয়ের চিৎকার শুনে স্থানীয়রা ছুটে এসে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। মেয়ের শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তিনি থানায় মামলা দায়ের করবেন বলে জানান।
তবে সাবেকুন ঠিক কী জাতীয় পদার্থে দগ্ধ হয়েছেন, তা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জয়পুরহাট ৪০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক মুর্শিদা পারভীন জলি জানান, রোগী কোনো দাহ্য বা প্রদাহ সৃষ্টিকারী পদার্থে দগ্ধ হয়েছেন। এটি গরম পানি নাকি অ্যাসিডজাতীয় কোনো রাসায়নিক, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে তাঁর চিকিৎসা কার্যক্রম চলমান।
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত স্বামী ও শ্বশুর পলাতক রয়েছেন বলে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে মোবাইল ফোনে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
পাঁচবিবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তামবিরুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। অভিযোগ বা মামলা পেলে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দগ্ধ শরীর নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় দিন কাটছে সাবেকুনের। নিজের চিকিৎসার পাশাপাশি সাড়ে তিন মাসের শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় দিনপাত করছেন তিনি। কোলে সন্তানকে নিয়ে আর কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন কি না—সেই অনিশ্চয়তাই যেন তাঁর যাতনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।