হোম > সারা দেশ > ঝালকাঠি

বিচারককে ধর্ষণ মামলার বাদী, ‘আসামির সাজা হলে আমাকেও ফাঁসি দিতে হবে’

আরিফ রহমান, ঝালকাঠি

প্রতীকী ছবি

ধর্ষণ মামলার আসামির বিচার না চেয়ে আসামিকে স্বামী হিসেবে পেতে চান এক নারী (৩০)। এ জন্য ঝালকাঠির নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হট্টগোল ও বিষ পানে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছেন তিনি।

আজ রোববার মামলার যুক্তিতর্ক শুনানির সময় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

ট্রাইব্যুনালের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ শরীফ মোহাম্মদ সানাউল হক বাদীর হট্টগোলের মধ্যে অনেক কষ্টে তাঁকে কিছুটা নিবৃত্ত করেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষে ট্রাইব্যুনালের পিপি মো. আককাস সিকদার ও আসামিপক্ষের আইনজীবী মল্লিক মুহা. নাসির উদ্দিন কবীরের যুক্তিতর্ক গ্রহণ করেন।

শুনানির সময় বারবার বাদী হট্টগোল শুরু করলে ট্রাইব্যুনালের বিচারক, আইনজীবী ও নারী পুলিশ সদস্যরা ডকে দাঁড়িয়ে থাকা বাদীকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। এ সময় বিচারক নারীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনি একটু ধৈর্য ধারণ করেন। বিচারে দোষী প্রমাণিত হলে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসিও হতে পারে, আবার সাজাও হতে পারে।’

একপর্যায়ে বাদী ট্রাইব্যুনালের বিচারককে বলেন, ‘আসামির সাজা হলে আমাকেও ফাঁসি দিতে হবে। আমি তার শাস্তি চাই না, তাকে চাই। তার চাকরিও ফেরত চাই।’

তখন ট্রাইব্যুনালের বিচারক তাঁকে বলেন, ‘মা, আমরা তো আসামিকে বাধ্য করতে পারব না আপনাকে বিয়ে করার জন্য, তার অপরাধ প্রমাণ হলে তাকে শাস্তি দিতে পারব।’

এতে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে নারী বলেন, ‘আপনি কাজী ডেকে তার সঙ্গে আমার বিয়ের ব্যবস্থা করেন।’ এরপর চিৎকার করে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘স্যার, আপনি যদি আসামি আল-আমিনের সঙ্গে আমার বিয়ের ব্যবস্থা না করেন, তাহলে আমি এ জীবন রাখব না, বিষ খেয়ে আপনার সামনে আত্মহত্যা করব।’

ঝালকাঠি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি অ্যাডভোকেট মো. আককাস সিকদার জানান, রোববার নারী ও শিশু মামলা নম্বর ১২৫/২৩-এর যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল। এ মামলার বাদী রাজাপুর থানার জগন্নাথপুর গ্রামের এক নারী। আসামি রাজাপুর থানার সাবেক এএসআই এবং পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার উত্তর মুরাদিয়া গ্রামের মো. ইউনুচ মোল্লার ছেলে মো. আল-আমিন মোল্লা।

পিপি জানান, ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ২০ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিয়ের প্রলোভন ও মিথ্যা বিয়ের নাটক সাজিয়ে নারীকে এএসআই আল-আমিন একাধিকবার ধর্ষণ করেছেন—এ অভিযোগে ২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মামলা দায়ের করেন নারী। ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর আল-আমিনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় অভিযোগ গঠন করে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।

এ মামলায় বাদী, বাদীর নাবালক ছেলেসহ চারজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ পর্যায়ে দুজন সাক্ষী দেশে নেই মর্মে বাদী নিজেই ট্রাইব্যুনালে জানান এবং সাক্ষ্য সমাপ্ত করার আবেদন করেন। সাক্ষীদের বিরুদ্ধে জারি করা পরোয়ানা তামিলকারী পুলিশও বাকি দুজন সাক্ষীর বিষয়ে একই প্রতিবেদন দাখিল করে। এরপর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আসামিকে পরীক্ষার সময় থেকেই বাদী তাঁর সঙ্গে বিয়ে ও কাবিননামার দাবি করতে শুরু করেন।

আজ রোববার যুক্তিতর্ক শুনানির দিন আসামিপক্ষের আইনজীবী যুক্তিতর্ক শুরু করলে মামলার বাদী তাঁর প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে উচ্চস্বরে কথা বলা ও হট্টগোল শুরু করেন।

মামলার আসামিপক্ষের আইনজীবী নাসির উদ্দিন কবীর বলেন, রোববার যুক্তিতর্ক শুনানির সময় মামলার বাদী ‘একাধিকবার কর্কশ ভাষায় আমার ওপরও চড়াও হয়েছেন, শুনানিতে আমাকে বারবার বেগ পেতে হয়েছে। একপর্যায়ে সে বিচারককে হুমকি দিয়েছেন এই বলে যে, আসামির সঙ্গে তাকে বিয়ের ব্যবস্থা করে দিতে হবে, না হলে সে রায়ের দিন ট্রাইব্যুনালে সবার সামনে নিজেকে শেষ করে দেবেন।’

ট্রাইব্যুনালের পিপি আককাস সিকদার আরও বলেন, ট্রাইব্যুনালের বিচারককে শুধু মৌখিকভাবে নয়, বাদীকে একটি লিখিত দরখাস্তের মাধ্যমেও আসামির সঙ্গে তাঁর বিয়ে পড়িয়ে দেওয়ার ‘উদ্ভট’ দাবি করেছেন। সেখানেও তিনি আসামি আল-আমিনকে স্বামী হিসেবে পেতে ট্রাইব্যুনালের প্রতি চাপ সৃষ্টি করেছেন। আর এর অন্যথা হলে তিনি এবং তাঁর আগের স্বামীর ঔরসজাত ছেলেসহ ট্রাইব্যুনালের সামনে আত্মহত্যা করার হুমকি দিয়েছেন।

পিপি আরও বলেন, ‘এমনকি বাদী আমার ব্যক্তিগত চেম্বারে গিয়ে আমাকেও হুমকি দিয়ে বলেছে, আমি যদি আসামি আল-আমিনকে স্বামী হিসেবে না পাই, তাহলে আপনাদের কাউকে ছাড়ব না। আমার নিজের জীবন দিয়ে আপনাদের সবাইকে ফাঁসিয়ে দেব।’

মামলার বাদী বলেন, ‘আমি ধর্ষণ মামলা করেছি আল-আমিনকে স্বামী হিসেবে ফেরত পেতে। তাকে সাজা দিয়ে আমার কী লাভ? আমি যেকোনোভাবে আল-আমিনকে চাই।’