পঞ্চাশোর্ধ্ব জেসমিন বেগম। যশোর শহরের তেঁতুলতলা এলাকার এই বাসিন্দা চার মাস ধরে চোখে ঝাপসা দেখেন। হঠাৎ দুই চোখ দিয়ে পানি ঝরছে তাঁর। স্বামী-সন্তান বেঁচে নেই। বিনা মূল্যে চক্ষু চিকিৎসার ক্যাম্পের কথা শুনে তিনি হাজির হন। সেবা নিয়ে ফেরার পথে জেসমিন বেগম বলেন, ‘কয়েক মাস দুই চোখে খুব জ্বালা-যন্ত্রণা করছে। ড্রপ দিয়েও কাজ হচ্ছে না। ডাক্তার দুই চোখ পরীক্ষার পর ওষুধ লিখে দিয়েছেন। ওষুধও ফ্রি পেয়েছি। ডাক্তার বলেছে কয়েক দিন পর এক চোখে আমেরিকান লেন্স লাগিয়ে দেবে।’
বিনা মূল্যের এই ক্যাম্পে জেসমিনের মতো হতদরিদ্র দেড় শ পঞ্চাশোর্ধ্ব বৃদ্ধা পেয়েছেন চক্ষু চিকিৎসা। যাঁদের মধ্যে ৩৫ জনের ছানি অপারেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চিকিৎসা দিয়েছেন বাংলাদেশ চক্ষুবিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক চিকিৎসক যশোরের স্বনামধন্য চক্ষু বিশেষজ্ঞ মাহমুদুর রহমান।
আজ শুক্রবার সকাল থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত যশোরে পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীদের বিনা মূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ও ছানি অপারেশন ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়েছে। শহরের জয়তী সোসাইটির মিলনায়তনে এই ক্যাম্পের আয়োজন করে আমেরিকার সাহায্য সংস্থা ইকো। ক্যাম্পের উদ্বোধন করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নার্গিস বেগম।
বেলা ১১টার দিকে সরেজমিন দেখা যায়, চক্ষু ক্যাম্পে প্রবেশের পর সেবাপ্রার্থীদের ক্রমিক নম্বর দিয়ে নির্দিষ্ট কক্ষে পাঠানো হচ্ছে। এসব কক্ষে টেকনিশিয়ান ও রিফ্রেকশনিস্টরা রোগীর প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। এরপর চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। ওই ব্যবস্থাপত্র দেখিয়ে একটি নির্দিষ্ট বুথ থেকে তাঁরা বিনা মূল্যে ওষুধ নিচ্ছেন। ওষুধ ও ব্যবস্থাপত্র পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন রোকেয়া বেগম নামে এক বৃদ্ধা। তিনি বলেন, ‘এখানে টাকা ছাড়াই চিকিৎসা করাতে পারছি। আবার ওষুধও দিয়ে দিছে। খুব উপকার হইল।’
সেবা পেয়ে খুশি নাজির শংকরপুর এলাকার তাসলিমা বেগমও। ৭০ বছর বয়সী নারীর স্বামী মারা গেছে তিন বছর আগে। এই নারী বলেন, ‘ছেলেরা দেখলেও তাদের অবস্থা দিন এনে দিন খাওয়ার মতো। ফলে আমার রোগ বালাইয়ের চিকিৎসার খরচ মেটাতে পারে না। অনেক দিন ধরে চোখে যন্ত্রণা করে। অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না। তবে আজকের ক্যাম্পে ফ্রি চিকিৎসা দিয়েছে। ওষুধও দিয়েছে। দ্রুত উন্নতি হবে বলেছেন চিকিৎসক।'
এর আগে ক্যাম্পের উদ্বোধনকালে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান চেয়ারম্যান নার্গিস বেগম বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি করে না। মানবসেবা ও দেশের জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য রাজনীতি করে। তারই অংশ হিসাবে যশোরে এক হাজারের বেশি চিকিৎসা ক্যাম্প করেছে। বিএনপি সরকার পিছিয়ে পড়া, হতদরিদ্র মানুষের কল্যাণে নানামুখী কল্যাণকর উদ্যোগ নিয়েছে। ধনী-গরিব সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বৈষম্যহীন একটা দেশ বিনির্মাণে সরকার কাজ করছে।’
এ সময় জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন, যশোর নগর মহিলা দলের সভাপতি শামসুর নাহার পান্না, যশোর পৌরসভার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনিছুর রহমান মুকুল এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রামার আরিফ নুর উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্বে করেন ইকোর প্রজেক্ট অফিসার আবদুল কাদের।
আবদুল কাদের বলেন, সমাজে পিছিয়ে পড়া হতদরিদ্র ব্যক্তিদের সচেতন করতে এবং আর্থসামাজিকভাবে সচ্ছল করতে সংগঠনটি কাজ করছে। পাশাপাশি সমাজের হতদরিদ্র মানুষকে প্রতিষ্ঠা করা এবং তাঁদের কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে যশোরের চাঁচড়ায় ইকো ট্রেনিং সেন্টার কাজ করছে। একই সঙ্গে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে ইকো জিএল ইনস্টিটিউট। এই প্রতিষ্ঠানে এতিম শিশু ও হতদরিদ্র ব্যক্তিরা বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়াসহ লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি সংস্থাটি দেশের বিভিন্ন জেলায় ফ্রি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যয়নরত মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চতর শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষাবৃত্তি প্রদানের মতো কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।