যশোরের মনিরামপুরে দেবিদাসপুর-পাতন ভায়া মাঝিয়ালি সংযোগ সড়কের হরিহর নদের ওপর নির্মিত কংক্রিটের সেতুটি ভেঙে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সেতুর পিলারে ফাটল দেখা দেওয়ার পাশাপাশি নিচের অংশের পলেস্তারা ধসে রড বেরিয়ে গেছে। ওপরের রেলিংয়ের পলেস্তারাও খসে পড়েছে। পাটাতনে ফাটল ধরে একদিকে হেলে পড়েছে পুরো সেতু।
ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় গত পাঁচ দিন ধরে সেতুটির ওপর দিয়ে যান ও মানুষ চলাচল বন্ধ রয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে দুই প্রান্তে বাঁশ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছেন স্থানীয়রা। মনিরামপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও সেতুটি ব্যবহার না করার নির্দেশ দিয়ে দুই পাশে নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছেন। এতে নদের দুই পাড়ের শতাধিক পরিবার এবং স্কুল-মাদ্রাসাগামী অন্তত শতাধিক শিক্ষার্থী চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ২০০৬ সালের দিকে হরিহর নদের ওপর সেতুটি নির্মাণ করা হয়। গত শনিবার সকালে তাঁরা দেখতে পান, সেতুটি মাঝ বরাবর দেবে গিয়ে ফেটে একদিকে হেলে পড়েছে। সেতুর নিচের পিলারের পলেস্তারা ধসে রড বেরিয়ে গেছে। সংযোগ সড়কেও দেখা দিয়েছে বড় ফাটল। যেকোনো সময় সেতুটি সংযোগ সড়কসহ ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নিস্তার ফারুককে বিষয়টি জানানো হলে সোমবার তিনি সেতুটির দুই পাশে সতর্কতামূলক নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়ে চলাচল বন্ধ করে দেন।
স্থানীয়দের ধারণা, সম্প্রতি সরকারি উদ্যোগে হরিহর নদ খনন করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে নদে পানি বেড়ে স্রোতের সৃষ্টি হয়। এতে সেতুর গোড়া থেকে মাটি সরে গিয়ে সেটি নিচের দিকে দেবে ভেঙে পড়েছে।
স্থানীয় পল্লিচিকিৎসক মুজাফফার হোসেন বলেন, সেতুটি পার হয়ে হরিহর নদের দক্ষিণ পাড়ে পাতন দাখিল মাদ্রাসা, মাদ্রাসা-সংলগ্ন মসজিদভিত্তিক শিশু শিক্ষা কার্যক্রম এবং পাতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শিক্ষার্থী দেবিদাসপুর গ্রামের। সেতুটি ভেঙে যাওয়ায় তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছে। অনেক অভিভাবক ঝুঁকি নিয়ে সন্তানদের সেতু পার করে স্কুল-মাদ্রাসায় নিয়ে যাচ্ছেন।
এলাকাবাসী জানান, পাতন ও দেবীদাসপুর গ্রামের কয়েক শ পরিবারকে সংযুক্ত করেছে সেতুটি। এ ছাড়া পাতন ও মাঝিয়ালি গ্রামের অনেক কৃষকের চাষাবাদের জমি দেবিদাসপুর এলাকায়। সেতুটির ওপর দিয়েই তারা কৃষিজমিতে যাতায়াত এবং ফসল আনা-নেওয়া করেন। দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণ করা না হলে নদের দুই পাড়ের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও কৃষিকাজ ব্যাহত হবে।
পাতন দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহাফুজ হোসেন বলে, ‘সেতু ভেঙে পড়ায় অনেক পথ ঘুরে মাদ্রাসায় যেতে হচ্ছে। এতে আমাদের সময় ও ভোগান্তি দুটোই বাড়ছে।’
মাদ্রাসাটির সহকারী প্রধান শিক্ষক আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শিক্ষার্থী দেবীদাসপুর গ্রামের। তারা এই সেতু পার হয়ে মাদ্রাসায় যাতায়াত করে। সেতুটি ভেঙে যাওয়ায় এখন প্রায় এক কিলোমিটার বেশি পথ ঘুরে তাদের আসতে হচ্ছে।’
মনিরামপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নিস্তার ফারুক বলেন, ‘হরিহর নদের এই স্থানে পুরোনো সেতুটি ভেঙে নতুন সেতু নির্মাণের জন্য দুই বছর আগে উপজেলা প্রকৌশলী দপ্তরকে জানানো হয়েছিল। এখন সেতুটি ভেঙে পড়ার পর বিষয়টি উপজেলা প্রকৌশলীকে আবারও জানানো হয়েছে। তাঁরা সরেজমিন এসে দেখে গেছেন। দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণের জন্য জোর দাবি জানানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মেপে দেখেছি, এখানে বিকল্প পারাপারের ব্যবস্থা করতে হলে প্রায় ১২০ ফুট দীর্ঘ বাঁশ বা কাঠের সাঁকো নির্মাণ করতে হবে। নদের গভীরতাও অনেক। ইউনিয়ন পরিষদের একার পক্ষে এ ধরনের সাঁকো নির্মাণের সামর্থ্য নেই। উপজেলাতেও এই মুহূর্তে বরাদ্দ নেই। তারপরও ইউএনও ও প্রকৌশলীর সঙ্গে আলোচনা করে বিকল্প ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা দেখছি।’
উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান বলেন, ‘সেতু ভেঙে যাওয়ার খবর পেয়ে সরেজমিন পরিস্থিতি দেখে এসেছি। দ্রুত নতুন সেতুর বরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে।’
স্থানীয়দের দাবি, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত অস্থায়ী পারাপারের ব্যবস্থা এবং স্থায়ীভাবে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হোক।