মনিরামপুর উপজেলার হরিদাসকাটি ও কুলটিয়া ইউনিয়নের হরিদাসকাটি ও পদ্মনাথপুর গ্রামকে সংযুক্ত করেছে মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের ওপর নির্মিত সেতুটি। ভবদহের জলাবদ্ধতায় সেতুটি ডুবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় দুই বছর আগে স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রায় ২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করে। তবে নির্মাণকাজের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মাত্র অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে।
সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর সময় ঠিকাদার পাশ দিয়ে কাঠের পাটাতন নির্মাণ করে বিকল্প পারাপারের ব্যবস্থা করেন। দীর্ঘদিন ব্যবহারে পাটাতনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে সেটি ব্যবহার করলেও গত সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিতে পাটাতনটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এখন তা আর পারাপারের উপযোগী নেই। ফলে দুই ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
মনিরামপুর উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লি সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পের (সিএএফডিআরআইআরপি) আওতায় নেহালপুর হাজিরহাট-কুলটিয়া ইউপি সড়কের খালের ওপর ২০ মিটার দীর্ঘ একটি আরসিসি গার্ডার সেতু পুনর্নির্মাণের কাজ ২০২৪ সালের ১ মে শুরু হয়। ২ কোটি ৭২ লাখ ৭৪ হাজার ৯৯২ টাকা ৮১ দশমিক ৬০ পয়সা ব্যয়ে সেতুটির নির্মাণকাজ ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ শেষ হওয়ার কথা ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া এ সেতুর নির্মাণকাজের দায়িত্ব পান সাতক্ষীরার ঠিকাদার ইকবাল জমাদ্দার। তাঁর পক্ষে মনিরামপুরের ঠিকাদার আব্দুল খালেক কাজটি বাস্তবায়ন করছেন।
স্থানীয়রা জানান, হরিদাসকাটি ইউনিয়নের হাজিরহাট বাজার থেকে কুলটিয়া ইউনিয়নের পদ্মনাথপুর হয়ে নেহালপুর বাজারগামী পাকা সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ চলাচল করেন। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মানুষের যাতায়াত থাকে। পথচারীরা সাইকেল, মোটরসাইকেল, ভ্যান ও ইজিবাইকে এ সড়ক ব্যবহার করে কেশবপুর ও অভয়নগরের নওয়াপাড়া শহরে যাতায়াত করে। বিশেষ করে হরিদাসকাটি ইউনিয়নের ভুলবাড়িয়া, পাঁচকাটিয়া, পাঁচবাড়িয়া ও লেবুগাতী এবং কুলটিয়া ইউনিয়নের ডাংপাড়িয়ালি, পদ্মনাথপুর, ডাঙ্গামহিষদিয়া ও পোড়াডাঙ্গা গ্রামের মানুষের অবাধ যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম এই সড়ক।
হাজিরহাট বাজার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে খালের ওপর পুরোনো সেতুটি ভেঙে নতুন সেতু নির্মাণের কাজ চলমান থাকায় এ সড়ক ব্যবহারকারীরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে রয়েছেন। খালের ওপর নির্মিত অস্থায়ী কাঠের পাটাতন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। অনেককে গন্তব্যে পৌঁছাতে পাঁচ থেকে ১০ কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে।
পাঁচকাটিয়া গ্রামের বাসিন্দা অমিতাব মল্লিক বলেন, ‘শনিবার মোটরসাইকেলে একটি কাজে পদ্মনাথপুর যাচ্ছিলাম। খালের কাছে গিয়ে দেখি কাঠের পাটাতনের ওপর প্রায় এক ফুট পানি। পানি অতিক্রম করে পার হওয়া সম্ভব হয়নি। পরে পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার পথ ঘুরে গন্তব্যে যেতে হয়েছে।’
হাজিরহাট-কুলটিয়া সংযোগ সড়ক ব্যবহারকারী পথচারীরা জানান, ২০২৪ সালে পুরোনো সেতু ভেঙে নতুন সেতুর কাজ শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ভারী বর্ষণে কাঠের পাটাতনসহ সড়কের একটি অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। পানি নেমে যাওয়ার পর ২০২৫ সালে আবার নির্মাণকাজ শুরু হয়। তখন জরাজীর্ণ পাটাতনটি সংস্কার করে পারাপারের ব্যবস্থা করা হয়। পরে সেতুর কাজ এগোলেও পাটাতনটি আবারও নড়বড়ে হয়ে পড়ে। কয়েক দিন আগে ঠিকাদার সেটি জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করেন। কিন্তু এরপরই ভারী বৃষ্টিতে খালের পানি বেড়ে পাটাতনটি আবার তলিয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পানির উচ্চতাও বাড়ছে।
ঠিকাদার আব্দুল খালেক বলেন, ‘দুই দফায় কাজ শুরুর পরই পানি উঠে নির্মাণস্থল তলিয়ে যায়। এ কারণে কাজ শেষ করতে বিলম্ব হচ্ছে। আশা করছি, আগামী মাসের মধ্যে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করতে পারব।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেতুর পাশের কাঠের সাঁকো কয়েক দিন আগে মেরামত করা হয়েছে। নতুন করে সেটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আমার জানা ছিল না।’
সেতুর নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা মনিরামপুর উপজেলা প্রকৌশলী দপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান বলেন, ‘সেতুর প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নতুন করে সেতুর দুই পাশের প্রয়োজনীয় জমি নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। আগামীকাল ঢাকা সদর দপ্তর থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধিদল আসবে। তাদের পরিদর্শনের পর সেতুর কাজ কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেতুর পাশের অস্থায়ী কাঠের সাঁকো পানিতে তলিয়ে যাওয়ার বিষয়টি জেনেছি। ঠিকাদারকে নিয়ে গতকাল রোববার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। তাঁকে সাঁকোটি উঁচু করে পুনর্নির্মাণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’