যশোর শহর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে ঝিকরগাছা উপজেলার দেউলি গ্রাম। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল কৃষক নওশের আলী ও শিরিনা আক্তার দম্পতির। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে একমাত্র ছেলে ইমতিয়াজ আহম্মেদ জাবির নিহত হওয়ার পর থেকে শোক যেন তাঁদের নিত্যসঙ্গী। ছেলের ব্যবহৃত জামা-কাপড়, বইপত্র ও কাগজপত্র ঘেঁটেই কিছুটা মানসিক শান্তি নিতে চান জাবিরের মা-বাবা।
কৃষক পরিবারের সন্তান জাবির ঢাকার সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ বিভাগে পড়াশোনা করতেন। পরিবার ও সহযোদ্ধাদের ভাষ্য, আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি সক্রিয় ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর রামপুরা এলাকায় পুলিশের টিয়ার শেল ও রাবার বুলেটে আহত হন তিনি। কিন্তু সুস্থ হওয়ার অপেক্ষা না করেই পরদিন, ১৯ জুলাই, আবারও আন্দোলনে যোগ দেন। ওই দিন বনশ্রী এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন জাবির। সহযোদ্ধারা তাঁকে প্রথমে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে অবস্থার অবনতি হলে জাতীয় হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউট এবং সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ঢামেক হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৬ জুলাই তিনি মারা যান।
জাবিরের মৃত্যুর শোকের পাশাপাশি আরেকটি বেদনা আজও তাড়া করে বেড়ায় পরিবারকে। তাঁদের দাবি, শেষবারের মতো ছেলের মরদেহ বাড়ির ভেতরে এনে স্বজনদের দেখার সুযোগও পাননি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ২৬ জুলাই রাতে জাবিরের মরদেহ দেউলি গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছিল। স্বজনদের ইচ্ছা ছিল পরদিন সকালে জানাজা শেষে দাফন করার। তবে সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের পক্ষ থেকে রাতেই দাফনের জন্য চাপ দেওয়া হয়। সেই কারণে মরদেহ বাড়ির ভেতরে নেওয়া হয়নি। এই আক্ষেপ আজও বয়ে বেড়াচ্ছে পরিবার।
জাবিরের বাবা নওশের আলী বলেন, ২৭ জুলাই সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মরদেহ নেওয়ার সময় সেখানে উপস্থিত কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁদের উদ্দেশে কটূক্তি করেন। তাঁর অভিযোগ, ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত যাত্রাপথেও বারবার ফোন করে দ্রুত দাফন করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এমনকি বাড়িতে কোনো আনুষ্ঠানিকতা না করে মরদেহ সরাসরি কবরস্থানে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। অন্যথায় পরিবারের সদস্যদের বিপদের মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
নওশের আলী বলেন, ‘ছেলে শহীদ হওয়ার দুই বছর হতে চলল। কিন্তু এখনো হত্যার বিচার পাইনি। যারা আন্দোলন দমনের নামে মানুষ হত্যা করেছে, তাদেরও বিচার দেখতে চাই।’ তিনি আরও জানান, ছেলে হত্যার ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৯৭ জনকে আসামি করে একটি মামলা করা হয়েছে। তাঁর একমাত্র প্রত্যাশা, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, তাঁরা শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি পেয়েছেন। এ পর্যন্ত জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে পাঁচ লাখ টাকা, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দুই লাখ টাকা, বিএনপির পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নওশের আলী স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে কৃষিজমি বিক্রি করেছিলেন। এমনকি বাড়ির মুরগির খামারও বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। সেই স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই চিরবিদায় নিয়েছেন জাবির।