যেদিকে চোখ যায়, পানি আর পানি। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি—সবখানেই জলাবদ্ধতার চিত্র। টানা বৃষ্টিতে যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে। বাড়ি থেকে রাস্তায় যাওয়া-আসা করতে হচ্ছে সাঁকো অথবা ডিঙিনৌকায়। বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক ডুবে যাওয়ায় হাজারো মানুষের দুর্ভোগ চরমে। অনেক পরিবার গবাদিপশু নিয়ে উঁচু সড়কে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। প্রতিদিনই পানি বাড়ায় পরিস্থিতি যাচ্ছে মানবিক বিপর্যয়ের দিকে। এমন পরিস্থিতিতে ভবদহ ও সংলগ্ন বিল এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনসহ চার দফা দাবিতে গতকাল সোমবার দুপুর ১২টা থেকে জলাবদ্ধ ভবদহ অঞ্চলের সহস্রাধিক নারী-পুরুষ জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের সামনে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছে। ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি এই কর্মসূচির ডাক দেয়।
এই ডাকে সাড়া দিয়ে কর্মসূচিতে এসেছেন মনিরামপুর উপজেলার পদ্মনাথপুর এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম। ‘পানি সরাও, মানুষ বাঁচাও’ সংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছেন তিনি। সাংবাদিকদের জানাচ্ছিলেন, ‘জলে ডুবেছে তাঁর ঘের, ফসলি জমি। বিলের পানি ঢুকে পড়েছে একমাত্র শোয়ার ঘরেও। হাঁটুপানি গোয়ালঘর, রান্নাঘরেও। কোমরপানি উঠানে। সাপ আর পোকামাকড়ের ভয়ে বউ-ছেলে-মেয়ে আর অসুস্থ মাকে নিয়ে উঠেছেন উঁচু রাস্তায়। সেখানেই অস্থায়ী পলিথিনের ঘরে আশ্রয় হয়েছে তাঁদের। বর্ষা এলেই জলের সঙ্গে এভাবে যুদ্ধ করা যেন রীতিতে পরিণত হয়েছে ষাটোর্ধ্ব এই জাহাঙ্গীরের। হঠাৎ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘সব সরকারই আশ্বাস দিল; আমাগের দুর্ভোগ সরল না। খুবই কষ্টে আছি। আমডাঙ্গার খাল খনন, বিল কপালিয়ায় টিআরএম চালু এবং পানি সরিয়ে ধান চাষ করার ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত আমি এখানে থাকব।’
ভবদহ জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে এর আগে চার দফা দাবি জানিয়েছিল ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি। এই দাবিতে গত ২৬ জুলাই জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পানিসম্পদমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেয় ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি। স্মারকলিপিতে বলা হয়েছিল, দ্রুত দাবি বাস্তবায়িত না হলে ৩ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ডিসি কার্যালয় চত্বরে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে। চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো ১. জরুরি ভিত্তিতে আমডাঙ্গা খাল সংস্কার সম্পন্ন এবং বিলম্বের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। ২. খর্ণিয়া দক্ষিণ পাশের বাঁধসহ সব অস্থায়ী বাঁধ অপসারণ এবং খর্ণিয়া থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত নদীর পলি অপসারণ। ৩. আইডব্লিউএমের সুপারিশ অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে টিআরএম (জোয়ারাধার) বাস্তবায়ন এবং নদী খননের সঙ্গে সমন্বিত সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ। ৪. পানিবন্দী মানুষের জন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সোমবার দুপুর ১২টার দিকে ভবদহ জলাবদ্ধ এলাকার সহস্রাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু ‘পানি সরাও, মানুষ বাঁচাও’ স্লোগান দিতে দিতে ডিসি কার্যালয়ের সামনে আসেন। তাঁদের অনেকের মাথায় ছিল মাথাল। কাঁধে ছিল লাঙল, মই ও নিড়ানি। হাতে ছিল জাতীয় পতাকা এবং বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড।
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে বলে জানিয়েছেন কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ।