মাত্র ৪৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদের মিলনস্থলে ধাঁধারচরসহ ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর খাসজমিতে দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত চেয়েছে সাননোভা এনার্জি। আবেদনের জমির মধ্যে ৩০ দশমিক ৭০ একর নদী শ্রেণিভুক্ত জমিও রয়েছে। এ অবস্থায় কৃষি, পর্যটন ও জীববৈচিত্র্যের সম্ভাবনাময় চরটি নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় জনসাধারণ ও পরিবেশবাদীরা।
গাজীপুর জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সাননোভা এনার্জির পরিচালক কামাল জামান মোল্লার স্বাক্ষর করা আবেদনে গত ১৬ আগস্ট গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে জমি বন্দোবস্ত চাওয়া হয়। অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫-এর আওতায় বিদেশি বিনিয়োগ ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জমি চাওয়া হয়েছে।
কাপাসিয়া উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের রাণীগঞ্জ ধাঁধারচর মৌজায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বর্তমান সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ও সবুজ শক্তি প্রসারের রূপকল্প বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানটি অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চায়।
আবেদনে আরও বলা হয়, দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ এবং টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করতে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের জন্য নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বৈদেশিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। কোরিয়া ও চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলার কথাও উল্লেখ করা হয়।
জমির বিবরণে বলা হয়েছে, নদী শ্রেণির দুটি দাগে ৩০ দশমিক ৭০ একর, বালুচর শ্রেণির তিনটি দাগে ১৩ দশমিক ৬৩ একর, সিকস্তি ভূমি শ্রেণির ১০৬ দাগে ৪৫ দশমিক ৮২ একর এবং নাল শ্রেণির ৯০ দাগে ১৫২ দশমিক ১৫ একর জমি চাওয়া হয়েছে। আবেদনে জমির ৬৩ শতাংশ নাল, ১৯ শতাংশ সিকস্তি ভূমি, প্রায় ১৩ শতাংশ নদী ও ৬ শতাংশ বালুচর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাননোভা এনার্জির পরিচালক কামাল জামান মোল্লা মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। গত সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর-১ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেলেও পরদিন তা স্থগিত করা হয়। পরে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিলেও ভালো ফল করতে পারেননি। পরবর্তীতে দল তাঁকে বহিষ্কার করে। কামাল জামান মোল্লা মাদারীপুর জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতিও ছিলেন।
ঘিঘাট গ্রামের বাসিন্দা জাহিদুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘এই চর আমাদের রুটিরুজির জোগান দেয়। এই চরে ৩০০ পরিবারের জীবন-জীবিকা। এখানে বিভিন্ন ধরনের কৃষি পণ্য উৎপাদন করা হয়। এটি একটি পর্যটনকেন্দ্রও। এখানে প্রচুর পরিমাণে পাখির আবাসস্থল। পাখির কিচিরমিচির শব্দে আশপাশ মুখরিত থাকে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাখির বংশবৃদ্ধির জন্য বাসা তৈরি করে দেওয়া হয়। এই চর আমরা হাতছাড়া হতে দেব না।’
স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল হক আঙ্গুর বলেন, ‘সকাল হলেই অর্ধশতাধিক নৌকায় শত শত মানুষ ধাঁধারচরে যায়। সেখানে ৫০০ পরিবারের জীবিকা রয়েছে। আম, জাম, পেয়ারা, বড়ইসহ বিভিন্ন ফল উৎপাদন হয়। ধান, গম, আখ, বাদামসহ বিভিন্ন ফসলও উৎপাদন হয়। এই জমিতে কোনোভাবেই কিছু করতে দেওয়া হবে না।’
সরেজমিনে ধাঁধারচরে গিয়ে দেখা গেছে, চরের দুই পাশে নদী এবং মাঝখানে ঘন সবুজ গাছপালা ও ফসলি জমি। নৌকায় করে কৃষকেরা চরে যাচ্ছেন। কেউ ফসলের মাঠে কাজ করছেন, কেউ গবাদিপশুর যত্ন নিচ্ছেন, কেউ ফল সংগ্রহ করছেন বাজারজাতের জন্য। চরে গবাদিপশুর জন্য ছোট-বড় কয়েকটি গোয়ালঘরও রয়েছে। ঘাস, লতাগুল্ম, ঝোপঝাড় ও গাছপালায় নানা প্রজাতির পাখির বিচরণ দেখা গেছে।
বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, ‘ধাঁধারচরের অধিকাংশ ভূমি নদী, বালুচর ও সিকস্তি ভূমি শ্রেণিভুক্ত। নদী ও নদীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ ধরনের ভূমি জনস্বার্থ ও পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় অত্যন্ত সংবেদনশীল। নদী একটি পাবলিক ট্রাস্ট প্রপার্টি; তাই নদী ও নদীসংলগ্ন ভূমি কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে বন্দোবস্ত দেওয়ার আগে এর পরিবেশগত ও জনস্বার্থগত বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি।’
মো. মনির হোসেন বলেন, ‘আইন অনুযায়ী নদী ও নদীসংলগ্ন ভূমি বন্দোবস্তযোগ্য নয়। আমার বিশ্বাস, জেলা প্রশাসন এ ধরনের ভূমি কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বন্দোবস্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে আইন ও পরিবেশগত বাস্তবতাকে যথাযথভাবে বিবেচনা করবেন।’
মো. মনির হোসেনের ভাষ্য, ধাঁধারচর জীববৈচিত্র্যের দিক থেকেও সমৃদ্ধ। চরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ প্রজাতির পাখির বিচরণ রয়েছে। বিভিন্ন প্রজাতির সরীসৃপ, লতাগুল্ম ও দেশীয় উদ্ভিদও রয়েছে। কৃষিকাজও পরিচালিত হচ্ছে সেখানে। তাঁর মতে, চরটি বিশেষ জীববৈচিত্র্য অঞ্চল হিসেবে ঘোষণার দাবি রাখে। এই চর বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্দোবস্ত দেওয়া হলে সেখানে অবকাঠামো নির্মাণ, ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন ও পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড বাড়বে। গাছপালা ও লতাগুল্ম ধ্বংস হতে পারে, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর অবাধ বিচরণ ব্যাহত হতে পারে এবং ধীরে ধীরে চরের স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য বিলীন হয়ে যেতে পারে।
মো. মনির হোসেন আরও বলেন, উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সেই উন্নয়ন হতে হবে প্রকৃতিবান্ধব ও টেকসই। ধাঁধারচরকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের দিকে না নিয়ে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে একটি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও পরিবেশশিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
সাননোভা এনার্জির পরিচালক কামাল জামান মোল্লার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে কয়েকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
কাপাসিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক বলেন, ধাঁধারচর মৌজার ১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর জমি রয়েছে। বন্দোবস্তের আবেদনের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। প্রতিবেদনটি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘ধাঁধারচরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য জমি বন্দোবস্ত চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ভূমি কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই ভূমি ইজারা দেওয়া যাবে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’