হোম > সারা দেশ > গাজীপুর

মা-বাবাকে টাকার লোভে ফেলে ৮ বছরের শিশুকে বিয়ে, অতঃপর...

রাতুল মণ্ডল, শ্রীপুর

প্রতীকী ছবি

অন্য পাঁচটা শিশুর সঙ্গে হইচই, খেলাধুলা ও পড়াশোনা করে সময় কাটছিল তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া মীমের (ছদ্মনাম)। হঠাৎ করেই ফুটফুটে মেয়েশিশুটির দিকে নজর পড়ে বড়লোকের এক বখাটে ছেলের। টাকার লোভে ফেলেন হতদরিদ্র মা-বাবাকে। সেই লোভেই মাদকাসক্ত ছেলের সঙ্গে জোরপূর্বক শিশুটির বিয়ে দেন মা-বাবা। কাজি ডেকে বিয়ে সম্পন্ন করেন। আসছে শুক্রবার ঘটা করে শিশুটিকে স্বামীর বাড়িতে পাঠানোরও আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। তবে সেই আয়োজন আর বাস্তবায়িত হয়নি শিশুটির বুদ্ধিমত্তা ও প্রশাসনের পদক্ষেপের কারণে। এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের ধনুয়া গ্রামে।

ভয়ভীতি ও হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে মা-বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে মীম ছুটে যায় প্রতিবেশী নানার বাড়িতে। আশ্রয় চায় প্রতিবেশী মামার। এরপর তাঁরা বিষয়টি প্রশাসনকে জানালে তৎপর হয়ে ওঠে প্রশাসনও।

ভুক্তভোগী শিশু শিক্ষার্থী জানায়, ১৫ দিন আগে তাকে পার্শ্ববর্তী ভালুকা উপজেলার কাশর গ্রামের রমজান আলীর ছেলে রুবেলের সঙ্গে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয়। তার মা-বাবা অনেক ভয়ভীতি ও হুমকি দেয়। বিয়ে না করলে তাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলবে—এমন আরও অনেক ভয়ভীতি দেখায়। ‘ছেলের বাবার অনেক টাকাপয়সা আছে, আমরা সুখে থাকব’— এমন আরও অনেক কিছু বলে লোভ দেখায়।

শিশুটি বলে, ‘হঠাৎ করে কাজি ডেকে এনে বিয়ে দিছে। আসছে শুক্রবার আমাকে স্বামীর বাড়িতে তুলে দিবে—এমন আলাপ চলছিল। মা-বাবার মুখে এমন আলাপ শুনে আজ রোববার বিকেলে মা-বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে প্রতিবেশী নানা সিরাজুল ইসলামের বাড়িতে যাই। মামা শরিফুল ইসলামকে সব খুলে বলি। তাঁরা সবকিছু জানার পর মা-বাবাকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তাঁরা ফোন বন্ধ করে রাখেন। মামা কয়েকজন নিয়ে সেখানে গেলে মা-বাবা আর ছেলেটা পালিয়ে যায়।’

শিশু মীমের প্রতিবেশী মামা শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘হঠাৎ করে শিশুটি এসে বিস্তারিত ঘটনা খুলে বলে। বিষয়টি শোনার পর আমাদের মাথা ঠিক ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে লোকজন নিয়ে শিশুর মা-বাবা আর ছেলেটিকে ধরতে যাই। কিন্তু আমাদের এমন তৎপরতার কারণে ওরা পালিয়ে গেছে। সঙ্গে থানা-পুলিশ ও ইউএনওকে (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) জানানো হয়। প্রশাসন সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করে। ইউএনও শিশুটিকে আমার হেফাজতে রাখতে নির্দেশনা দিয়েছেন। ছেলেটা চিহ্নিত মাদকাসক্ত। টাকার লোভে পড়ে এমন কাজ করছে তার মা-বাবা। এই মেয়ে বিয়ের কিছু বোঝে?’

স্থানীয় কিন্ডারগার্টেন স্কুলের পরিচালক বলেন, ‘মেয়েটি আমার স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। বিষয়টি আমার নজরে আসার পরপরই প্রশাসনকে অবহিত করি।’

অভিযুক্ত মায়ের বক্তব্য নিতে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ জন্য বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

গাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. মাহাবুব আলম বলেন, বিষয়টি নজরে আসার পরপরই ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ও গ্রাম পুলিশকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। এর আগেই শিশুটির মা-বাবা ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যায়। আপাতত শিশুটিকে তার প্রতিবেশী নানার বাড়িতে আশ্রয়ে রাখতে বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘খোঁজখবর নিয়ে যত দূর জানতে পারছি, ছেলেটি চিহ্নিত মাদক কারবারি। তার নামে তিনটি মাদক মামলা রয়েছে।’

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ ভূঁইয়া বলেন, ইতিমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শিশুটিকে নিরাপদে রাখতে সব ধরনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে পদক্ষেপ নিতে নিদর্শনা দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত কাজিকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে। মা-বাবাকেও খুঁজে এনে শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।