গাজীপুরের টঙ্গীতে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের দাবিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। গতকাল শনিবার রাতে সড়ক দুর্ঘটনায় মাদ্রাসার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়াসিন আলীর মৃত্যুর প্রতিবাদে আজ রোববার বেলা ১১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত গাজীপুরা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এই অবরোধ চলে। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন প্রত্যাহার করলে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
দীর্ঘ সাড়ে তিন ঘণ্টার অবরোধে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ২২ জেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয় এবং কয়েক কিলোমিটারজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। চরম ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো যাত্রী ও পথচারী।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গতকাল রাতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক পার হওয়ার সময় গাজীপুরা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বেপরোয়া গতির একটি কাভার্ড ভ্যানের চাপায় তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়াসিন আলী নিহত হয়। দুর্ঘটনার পর কাভার্ড ভ্যানটি জব্দ করা হলেও চালক পালিয়ে যান।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মাদ্রাসাটিতে প্রায় ১৪ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক পারাপার হয়। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ পারাপারের জন্য ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এই অবস্থায় মাদ্রাসাশিক্ষার্থীরা আজ বেলা ১১টার দিকে গাজীপুরা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নেয়। ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেয় এবং মাদ্রাসার সামনে দ্রুত ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানায়।
অবরোধের কারণে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় প্রায় ১৫ কিলোমিটারজুড়ে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। ঢাকা ও গাজীপুরের পাশাপাশি মহাসড়ক ব্যবহার করে চলাচলকারী বিভিন্ন জেলার যাত্রীরাও দুর্ভোগে পড়েন। বেলা ৩টার দিকে ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ কমিশনার (ট্রাফিক) আশরাফুল আলম বলেন, প্রায় চার ঘন্টা ব্যাপি শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নেওয়ায় টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার এবং টঙ্গী-কালীগঞ্জ শাখা সড়কে আরো ১ কিলোমিটার, সেই সঙ্গে রাজধানীর উত্তরা আজমপুর পর্যন্ত আরও ২ কিলোমিটার সড়ক জুড়ে যানজট দেখা দেয়।
দীর্ঘ সময় আন্দোলনের পর গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার, জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূঁইয়া ও গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার ইসরায়েল হাওলাদার মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে আসেন। প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্যাম্পাসে এসেছেন—এ খবর পেয়ে শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক থেকে সরে সেখানে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসে।
আলোচনায় শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী ইয়াসিন আলীর পরিবারকে আগামী তিন দিনের মধ্যে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তিন লাখ টাকা দেওয়া হবে। একই সময়ের মধ্যে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণকাজের অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে। যত দ্রুত সম্ভব সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে নিহত শিক্ষার্থী ইয়াসিন আলীর পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের অন্যান্য দাবি পূরণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমি তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট। আমাদের আসার খবর পেয়ে তোমরা মহাসড়ক থেকে সরে এসেছ। তোমাদের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।’
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার ইসরায়েল হাওলাদার বলেন, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত ওই এলাকায় স্পিডব্রেকার স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করা হবে।
মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ড. হিফজুর রহমান প্রশাসনের দেওয়া আশ্বাসে সন্তোষ প্রকাশ করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিজ নিজ বাসায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি প্রশাসনের ইতিবাচক অবস্থানের প্রশংসা করেন।
মাদ্রাসার ভিপি মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রশাসনের কাছ থেকে লিখিত আশ্বাস নিইনি, তাদের কথায় বিশ্বাস রেখেছি। আমরা আশাবাদী, তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রাখবে এবং নিরাপদ পারাপারের জন্য দ্রুত ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করবে। তা না হলে আমরা আরও তীব্র আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব।’
প্রশাসনের আশ্বাসের পর শিক্ষার্থীরা আন্দোলন প্রত্যাহার করে মহাসড়ক ছেড়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তবে দীর্ঘ সময়ের অবরোধে সৃষ্ট যানজট পুরোপুরি কাটতে কিছুটা সময় লাগে।