হোম > সারা দেশ > গাজীপুর

নয় বছর ধরে নিজেকে জীবিত করার লড়াই, আজ তিনি ক্লান্ত

রাতুল মণ্ডল, শ্রীপুর

আবুল কাশেম। ছবি: সংগৃহীত

গাজীপুরের শ্রীপুরের বাসিন্দা মো. আবুল কাশেম কাগজপত্রে ২০১৪ সাল থেকে মৃত। ২০১৭ সালে বয়স্ক ভাতা তুলতে গিয়ে বিষয়টি জানতে পারেন তিনি। সেই থেকে নিজেকে জীবিত প্রমাণ করতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে আজ তিনি ক্লান্ত।

আবুল কাশেমের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কাগজপত্রে তাকে ‘জীবিত’ করার জোর দাবি জানিয়েছেন তাঁর পরিবার ও প্রতিবেশীরা। গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লোহাগাছ গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা মৃত মাঈন উদ্দিন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সত্তরোর্ধ্ব মো. আবুল কাশেম জন্মসূত্রে ওই গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর পৈতৃক নিবাসও এই গ্রামে। অন্যদের মতো তাঁরও আছে জাতীয় পরিচয়পত্র। তবে, সেটি দিয়ে ২০১৭ সালে বয়স্ক ভাতার টাকা ওঠাতে গেলে তাঁকে বলা হয় "আপনি মৃত"। সে কারণে আর টাকা পাওয়া যাবে না। এ কথা শুনে হতভম্ব কাশেম ছুটে যান উপজেলা নির্বাচন অফিসে। সেখানেও তাঁকে জানানো হয়, ২০১৪ সালে বরিশালে গিয়ে তিনি মারা গেছেন।

আবুল কাশেমের ভোটার আইডি। ছবি: সংগৃহীত

এরপর থেকেই আরেকবার নিজেকে জীবিত করার চেষ্টা শুরু করেন আবুল কাশেম। একাধিক বার আবেদন করেও এখনো পর্যন্ত নিজেকে জীবিত করতে পারেননি বলে জানান আবুল কাশেম ও তাঁর পরিবার। দাপ্তরিক ভুলের কারণে আর যাতে কোনো জীবিত মানুষকে মৃতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে হয়রানি করা না হয়, সেই দাবি তাঁদের।

নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে মো. আবুল কাশেম বরিশালের বাবুগঞ্জের একটি ইউনিয়নে মাইগ্রেশন করেন। একই বছরে তিনি মারা গেছেন মর্মে ওনার পক্ষে আজিজুর রহমান নামের একজন আবেদন করে তাঁর মৃত্যু সনদ দাবি করেন। পরে স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বারের স্বাক্ষরিত পত্রের মাধ্যমে তাকে মৃত ঘোষণা হয়। একই সঙ্গে ভোটার আইডি কার্ডও কেটে ফেলা হয়।’

ভুক্তভোগী আবুল কাশেম বলেন, ‘কয়ডা ট্যাহা বয়স্ক ভাতা পাইতাম। হেইডাও বন্ধ কইরা দিছে। আমি বলে মইরা গেছি। বাইচ্চা থাকতেও আমাকে মাইরাইলসে-- কেমনে মাইন্না লই। মেম্বার চেয়ারম্যানের পিছে ঘুরতে ঘুরতে জুতার তলি ছিড়া গেছে। আর কবে জ্যাতা হইমু।’

স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, ‘আমাদের গ্রামের বাসিন্দা আবুল কাশেম। উনি সবসময়ই আমাদের চোখের সামনে আছেন। আজও একসঙ্গে চা খেয়েছি। কয়েক বছর আগে শুনলাম তিনি নাকি মরে গেছেন। আমরা কবর দিলাম না, জানাজা দিলাম না তাহলে মরলেন কীভাবে?’

আমির হোসেন নামে একজন বলেন, ‘উনাকে দীর্ঘদিন ধরেই চিনি। অত্যন্ত ভালো মানুষ। উপজেলা নির্বাচন অফিসের মাধ্যমে আবুল কাশেমকে জীবিত করে ভোটার তালিকায় আবার নাম অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি করছি।’

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বাহাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আইডি কার্ডের বিষয়টি সমাধান করবে নির্বাচন অফিস। কার্ডে জীবিত থাকলে আবেদনের মাধ্যমে আবারও তাঁকে ভাতার আওতায় আনা হবে।’

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) তামান্না রশিদ বলেন, ‘আমি এ উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্বে আছি। আগে কয়দিন আসছেন, সেটা আমি জানি না। আজকে ওনার কাগজপত্র বিবেচনা করে বুঝতে পারছি উনি মাইগ্রেশন করে বাবুগঞ্জ চলে যাওয়ার পর সেখানেই তিনি মারা গেছেন মর্মে উল্লেখ রয়েছে। সেই উপজেলায় গিয়ে আইডি কার্ডে সংশোধন করতে হবে। সেখানে যোগাযোগ করলে সমাধান হবে।’

গাজীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘ভুক্তভোগী ব্যক্তি জেলা অফিসে আসলে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। এখান থেকে সমাধান করা গেলে আমরা করে দেব। আর না হলে কিভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে সংশোধন করা যাবে, সে পরামর্শ দেওয়া হবে।’