শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা করায় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় মাদ্রাসাছাত্রীকে। সেই হত্যাকে আবার আত্মহত্যা বলে চালানোরও চেষ্টা করা হয়। এমনি পরিস্থিতিতে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির জন্য ৭ বছর ধরে লড়েছে নুসরাতের পরিবার। অবশেষে চূড়ান্ত রায় ঘোষণায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার।
আজ সোমবার দুপুরে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া এলাকায় নিজ বাড়িতে রায়-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় নুসরাতের মা বলেন, এ রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, নুসরাতের ঘটনা আত্মহত্যা নয়, হত্যাকাণ্ড। একই সঙ্গে তিনি পরিবারের নিরাপত্তা দাবি করেন।
শিরিন আক্তার বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট। নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পর অনেকে এটাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করেছিল। কিন্তু আজকের রায়ের মধ্য দিয়ে এটা যে হত্যাকাণ্ড ছিল, তা প্রমাণিত হয়েছে।’
পরিবারের নিরাপত্তার প্রসঙ্গে শিরিন আক্তার বলেন, ‘বাড়িঘরে আগুন দিয়ে আমাদের শেষ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে আমাদের পরিবারের নিরাপত্তা চাই।’
বহুল আলোচিত এ মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। তাঁরা হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম।
এ ছাড়া চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন আদালত। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি হলেন উম্মে সুলতানা পপি, মোহাম্মদ নুরুদ্দিন, শাহাদাত হোসেন জাবেদ ও ইফতেখার হোসেন রানা।
খালাস পাওয়া ১০ আসামি হলেন মোহাম্মদ শামীম, রুহুল আমিন, আফসার উদ্দিন, মাকসুদ কাউন্সিলর, হাফেজ আব্দুল কাদের, আব্দুর রহিম শরীফ, ইমরান হোসেন মামুন, মহিউদ্দিন শাকিল, কামরুন নাহার মনি ও অপর একজন আসামি।
আজ দুপুরে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। সোয়া দুই ঘণ্টাব্যাপী রায় ঘোষণা করা হয়। বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা পুরো রায় পড়ে শোনান।
রায় ঘোষণার সময় আদালতের এজলাস কক্ষে আসামি ও ভুক্তভোগীর স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে ২০ আগস্ট নুসরাত হত্যা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় মামলা হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে মামলা তুলে না নেওয়ায় সিরাজ উদদৌলার নির্দেশে ওই বছরের ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এ মামলার রায় দেন। রায়ে তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
পরে ডেথ রেফারেন্সের জন্য নুসরাত হত্যা মামলার রায়সহ নথিপত্র ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছায়। মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নম্বরভুক্ত হওয়ার পর আসামিরাও পৃথক আপিল ও জেল আপিল করেন।
দীর্ঘ শুনানি শেষে আজ হাইকোর্টের রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল ও চারজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে খালাস পান ১০ আসামি।