ফরিদপুরে স্ত্রীর দায়ের করা পর্নোগ্রাফি আইনের মামলায় মীর ইলিয়াস ওরফে সোহেল (৩৯) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আজ শুক্রবার সকালে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক মো. গিয়াস উদ্দিন সরদার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির পরিবার দাবি করেছে, টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে তাঁকে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার হওয়া মীর ইলিয়াস ওরফে সোহেল ফরিদপুর পৌরসভার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাফুরা এলাকার মীর আলমগীরের ছেলে। তিনি একটি বেসরকারি এনজিওতে কর্মরত। কোতোয়ালি থানা সূত্রে জানা গেছে, ২৭ জুলাই গভীর রাতে জেলার বোয়ালমারী উপজেলার কালিনগর গ্রামে তাঁর কর্মস্থল থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার বাদী পার্শ্ববর্তী গেরদা গ্রামের বাসিন্দা তৌফিক মীরের মেয়ে তমা আক্তার (৩০)। তিনি সোহেলের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে জানা গেছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল আসামি বাদীর কাছে ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। এ ঘটনায় সেদিন সদরপুর থানায় একটি যৌতুক মামলা করা হয়। পরে ওই মামলা তুলে নিতে চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং দাম্পত্য জীবনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ধারণ করা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। মামলা তুলে না নেওয়ায় আসামি তাঁর ব্যবহৃত ফেসবুক অ্যাকাউন্টসহ তিনটি অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিও ছড়িয়ে দেন এবং সেসব অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা দাবি করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ঘটনাটি নিয়ে ভিন্ন দাবি করেছেন গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির পরিবার ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁদের ভাষ্য, বাদীর এর আগে দুটি বিয়ে হয়েছিল। দ্বিতীয় স্বামীর সংসারে থাকাকালে বিরোধের জেরে তিনি সেখান থেকে চলে আসেন। এরপর ২০২৪ সালে মীর ইলিয়াস ওরফে সোহেলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা পরে অনৈতিক সম্পর্কে রূপ নেয়।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, ওই সম্পর্কের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করেন ওই নারী নিজেই এবং পরে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনার পর সোহেলের প্রথম স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। পরে কৌশলে সোহেলকে ওই নারীর বাড়িতে নিয়ে আটকে রাখা হয় এবং স্থানীয়ভাবে সালিসের মাধ্যমে মীমাংসা করা হয়।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সালিসের সিদ্ধান্তে ২০২৪ সালের ২৯ মে ৪ লাখ টাকা দেনমোহরে তাঁদের বিয়ে হয়। কাবিননামায় মুচলেকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়, স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে যে-ই সংসার ছেড়ে চলে যাবে, তাকে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে।
পরিবারের দাবি, প্রায় তিন মাস আগে ওই নারী সদরপুর থানায় একটি যৌতুক মামলা করেন। ওই মামলায় সম্প্রতি জামিন পাওয়ার পর ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকির অভিযোগ এনে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় পর্নোগ্রাফি আইনে আরেকটি মামলা করেন। পরিবারের আরও দাবি, ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করে বিয়ে করা হয়েছে এবং কাবিননামায় উল্লেখিত টাকা আদায়ের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। সোহেলের স্ত্রীর কাছে তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাসওয়ার্ডও রয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেছেন।
সোহেলের মা তছিরন বেগম বলেন, ‘দ্বিতীয় স্বামী থাকতেও আমার ছেলেকে ফাঁদে ফেলে নির্যাতন করে বিয়ে করেছে। ওর কারণে আমার প্রথম বউ ও নাতি চলে গেছে। ৭ মাসের একটি বাচ্চাসহ বিয়ে করে আনতে বাধ্য হয়। তারপরও আমরা সব মেনে নিয়েছি। কিন্তু বিভিন্ন সময় ওর পরিবার আমাদের ভয়ভীতি দেখায় এবং পুলিশ দিয়ে হয়রানি করেছে। বর্তমানে অপবাদ দিয়ে আমার ছেলেকে জেলে পাঠিয়েছে। আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা পাব কোথায়। আমরা প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানাই এবং প্রকৃত দোষীর শাস্তি চাই।’
বাদীর বাবার বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি জানতে চাইলে বাদী তমা আক্তার বলেন, ‘যা বলার থানায় বলা হয়েছে।’ তিনি ঘটনা নিয়ে আর কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. গিয়াস উদ্দিন সরদার বলেন, ‘স্ত্রীর পর্নোগ্রাফি আইনে করা মামলায় ইলিয়াসকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং একটি মোবাইল জব্দ করা হয়েছে। মোবাইলটি সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে, প্রতিবেদন হাতে পেলে প্রকৃত কারণ জানা যাবে। ২০২৪ সালের ঘটনার বিষয়ে তিনি জানেন না বলেও মন্তব্য করেন।