হোম > সারা দেশ > ফরিদপুর

সন্তান কোলে নিয়ে বাঁচা হলো না বীথির, পেটে গজ রেখে সেলাইয়ের পাঁচ মাস পর মৃত্যু

ফরিদপুর প্রতিনিধি

বীথি আক্তার । ছবি: সংগৃহীত

‘আমার সন্তানকে কোলে নিয়ে বাঁচতে চাই’—মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালে নবজাতক সন্তানকে কোলে নিয়ে বেঁচে থাকার আকুতি জানিয়েছিলেন গৃহবধূ বীথি আক্তার (২৩)। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই আকুতি পূরণ হলো না। সন্তান জন্মদানের সময় অস্ত্রোপচারের পর পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগের পাঁচ মাস পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তিনি।

আজ বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বীথির মৃত্যু হয়। তিনি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের জামতলার হাট জ্যোতিনবর্দীপাড়া গ্রামের রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী। ফরিদপুর শহরের একটি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী বীথি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবেও কাজ করছিলেন।

দুপুরে বীথির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে তাঁর স্বামী রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘আশঙ্কাজনক অবস্থায় গত ৪ অক্টোবর ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঢাকায় নেওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর আজ সকালে তিনি মারা যান।’ পরে দুপুরে বীথির মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

রাকিবুল অভিযোগ করে বলেন, ‘সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে আমার স্ত্রীকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আমি ব্যর্থ হলাম। ওরা আমার স্ত্রীকে মেরে ফেলছে। আমার এই সন্তানকে এখন বাঁচাব কী করে। আমি বিচার চাই।’

বীথির পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর অস্ত্রোপচার করেন চিকিৎসক তামান্না আক্তার ও ইন্টার্ন চিকিৎসক অরবিন্দু। ওই সময় বীথি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। পাঁচ দিন পর তিনি হাসপাতাল থেকে স্বামীর বাড়িতে ফিরে যান। এরপর থেকেই তাঁর শারীরিক অসুস্থতাসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়।

পরিবারের ভাষ্য, একপর্যায়ে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকের কাছে গেলে গুরুতর কোনো সমস্যা হয়নি বলে তাঁকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে প্রায় দেড় মাস পর দুই দফায় দুটি বেসরকারি হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয়। সেখানে তাঁর পেটের ভেতর গজ কাপড় থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।

এরপর গত ১২ জুলাই বীথিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। তিন দিন পর ১৫ জুলাই সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলুল হক শোভন ও সঞ্জয় সাহা তাঁর দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার করেন। এ সময় পেটের ভেতর থেকে গজ কাপড় বের করা হয় বলে পরিবার জানায়। তখন তাঁর নাড়িতে পচন ও সংক্রমণ দেখা দেয়।

পরবর্তী সময়ে ২২ জুলাই তাঁকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়। তবে পেটের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি আবার ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ সময় তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়।

গত ২ অক্টোবর বীথি নিজেই বাঁচার আকুতি জানান। ওইদিন ‘সিজারিয়ানের পর পেটে গজ রেখে সেলাই, সংকটাপন্ন বীথি বাঁচতে চান সন্তানের জন্য’ শিরোনামে আজকের পত্রিকার অনলাইনে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ সময় তাঁর পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ করেন।

এ বিষয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত পরিচালক) মানস কৃষ্ণ কুন্ডু আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বীথির চিকিৎসার জন্য আমরা একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছিলাম। বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবার আমাদের জানিয়েছে।’

তিনি বলেন, এ ঘটনায় গঠিত ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য কমিটিকে সাত কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়েছিল। সময় শেষ হওয়ায় কমিটি আরও সময় চেয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।