ফরিদপুরে বেসরকারি আল-জারা স্পেশালাইজড হাসপাতালে অস্ত্রোপচারে রোগী মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ। একই অভিযানে অব্যবস্থাপনা ও অনুমতিবিহীন কার্যক্রমের অভিযোগে আরও চারটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রমও বন্ধ করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে অবস্থিত এসব প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায় জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ। অভিযানে নেতৃত্ব দেন সিভিল সার্জন ডা. মাহামুদুল হাসান। উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুর রহমান ও নাজমুন নাহার নাঈম।
অভিযানকালে আল-জারা স্পেশালাইজড হাসপাতাল, মেডিকো হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, লিলি প্রাইভেট হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হলিসিটি প্রাইভেট হাসপাতাল এবং মা-মনি ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি থাকা রোগীদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অথবা অন্য উপযুক্ত হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ জুলাই আল-জারা স্পেশালাইজড হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর আয়েশা আফরিন (১৭) নামে এক কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার বিষয় উঠে আসার পর জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ সরেজমিন পরিদর্শন করে।
পরিদর্শনে হাসপাতালটির অস্ত্রোপচার কক্ষে অব্যবস্থাপনা, অস্ত্রোপচার রোগীদের সিটে মনিটর না থাকা এবং ৩০ সিটের হাসপাতালের জন্য বিধি অনুযায়ী পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স না থাকার বিষয়টি পাওয়া যায়। পরে হাসপাতালটির অস্ত্রোপচারসহ সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেন সিভিল সার্জন মাহামুদুল হাসান। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক আতিকুল আহসানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
সিভিল সার্জন মাহামুদুল হাসান বলেন, ‘আমরা যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলাম তার প্রতিবেদনে অব্যবস্থাপনা ফুটে উঠেছে। হাসপাতালটিতে ৩০ বেডের জন্য ৯ জন চিকিৎসক ও ১৮ জন নার্স থাকার নিয়ম থাকলেও মাত্র ১ জন চিকিৎসককে আমরা পেয়েছি; পর্যাপ্ত নার্সও নেই। এছাড়া ওটি রুমের ভাল ম্যানেজমেন্ট নেই। সব মিলে এই হাসপাতালের কার্যক্রম আজ থেকেই বন্ধ থাকবে।’
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যিনি অস্ত্রোপচার করেছেন তিনি একজন অভিজ্ঞ সার্জন এবং সহকারী অধ্যাপক। এই হাসপাতালে এসে অস্ত্রোপচার করা তাঁর ঠিক হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধেও আমরা ব্যবস্থা নেব এবং শোকজ করা হবে।’
জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ একই এলাকার অন্য চারটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও অভিযান চালায়। অব্যবস্থাপনা ও লাইসেন্সবিহীন পরিচালনার অভিযোগে সেগুলোর কার্যক্রমও বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান সিভিল সার্জন। তিনি বলেন, ‘যেখানে নিয়ম বহির্ভূতভাবে স্বাস্থ্যসেবার কার্যক্রম পরিচালিত হবে, সরকারি নির্দেশনা মেতাবেক আমরা সেগুলো বন্ধ করে দেব। প্রতিটি মানুষ যাতে মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবা পায়, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের।’
প্রসঙ্গত, গত ১৬ জুলাই পেটে ব্যথা নিয়ে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আয়েশা আফরিনের অ্যাপেন্ডিসাইটিস ধরা পড়ে। পরে আল-জারা স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি হলে রাতে পুনরায় পরীক্ষা ছাড়াই তাঁর অস্ত্রোপচার করেন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আতিকুল আহসান। পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে শহরের অন্য একটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। পরদিন সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত আয়েশা আফরিন ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আকোটেরচর ইউনিয়নের কালিখোলা গ্রামের সৌদি প্রবাসী লিটু মাতুব্বরের বড় মেয়ে। তিনি জেলা শহরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।