ফরিদপুরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে প্রান্ত (২৭) নামে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) ১১ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সুপারিশ করা হয়েছে। জেলা পুলিশের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে ফরিদপুর জেলা পুলিশ।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, অভ্যন্তরীণ তদন্তের আলোকে অভিযানে অংশ নেওয়া ডিবি পুলিশের ওই ১১ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।
যাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—ডিবি পুলিশের ওসি মো. আলমগীর হোসেন, উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আহাদুজ্জামান ও মোতাহার আলী, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. হাজিকুল ইসলাম, কনস্টেবল আবু সুফিয়ান, রাকিব মোল্লা, মনিরুজ্জামান, মো. রাকিবুল ইসলাম, ফরহাদ হোসেন মিয়া, চম্পা হালদার এবং গাড়ির চালক মো. সবুজ মোল্লা।
এর আগে, গত ২০ জুন বিকেলে মধুখালী পৌরসভার পশ্চিম গোন্ধারদিয়া এলাকায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে নিজ বাড়ির সামনে থেকে ইশতিয়াককে আটক করে ডিবি পুলিশ। পরদিন (২১ জুন) সকালে ডিবির হেফাজতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত ইশতিয়াক আহমেদ পশ্চিম গোন্ধারদিয়া মহল্লার মৃত এসকেন হায়দারের ছেলে। তিনি ফরিদপুর আইন কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং স্থানীয় একটি চিনিকলে মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তিনি স্থানীয় ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনার পর ২১ জুন সকালে অভিযানে অংশ নেওয়া ডিবির এসআই আহাদুজ্জামান বাদী হয়ে মধুখালী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় দাবী করা হয়, ২০ জুন দিবাগত রাত ২টার দিকে ইশতিয়াককে আটক করা হয় এবং তিনি নিজ হাতে তাঁর প্যান্টের পকেট থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজা বের করে দেন।
তবে ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। ফুটেজ অনুযায়ী, ঘটনাটি রাতে নয়, দিনের বেলায় ঘটেছে। সে সময় ইশতিয়াক প্যান্ট নয়, লুঙ্গি পরিহিত ছিলেন। ভিডিওতে দেখা যায়, এক ডিবি সদস্য ইশতিয়াকের মাথায় আঘাত করে শরীর তল্লাশি করছেন। তল্লাশির একপর্যায়ে কয়েক হাত দূরে গিয়ে এক পুলিশ সদস্য ‘এই যে এক টোপলা’ বলে চিৎকার করে ওঠেন।
এ ছাড়া, মাদক উদ্ধারের মামলায় মো. আলমগীর হোসেন ও বিনয় সাহা নামের দুজনকে সাক্ষী করা হয়েছিল। পুলিশের দাবি ছিল, তাঁদের সামনেই ইশতিয়াক গাঁজা বের করে দেন। কিন্তু এই দুই সাক্ষী পরে তদন্ত কমিটির কাছে জানান, ঘটনার সময় তাঁরা অন্তত ১০০ মিটার দূরে মধুখালী বাজার এলাকায় ছিলেন। তাঁদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ও মিথ্যা কথা বলে পরে কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।
ইশতিয়াকের মা খাদিজা আক্তারের অভিযোগ, আটকের পর ২০ জুন দিবাগত রাতে তাঁর ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ৬৫ হাজার টাকা দাবি করেছিল ডিবি পুলিশ। পরে ডিবি কর্মকর্তারা জানান, ইশতিয়াক যেহেতু কলেজে পড়ে এবং রাজনীতি করে, তাই এক লাখ টাকা নিয়ে পরদিন সকালে ফরিদপুর যেতে হবে।
খাদিজা আক্তার তদন্ত কমিটির কাছে জানিয়েছেন, পরদিন সকালে এক লাখ টাকা নিয়ে ফরিদপুরে গিয়ে তিনি ছেলের জীবিত দেহের বদলে লাশ পান।
ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার পর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. শামসুল আজম এবং জেলা স্পেশাল ব্রাঞ্চের ওসি মোশাররফ হোসেন।
গত ২৭ জুলাই তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন পুলিশ সুপারের কাছে জমা দেয়। এরপর প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ সেটি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়।
পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী বলেন, ‘ওই দিন ওসির নির্দেশে ডিবি পুলিশের যেসব সদস্য অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরা সকলেই কোনো না কোনোভাবে অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত। এ ব্যাপারে সকলেরই কমবেশি ভূমিকা রয়েছে।’
তবে ভিডিও ফুটেজ, সময় ও পোশাকের অসংগতি, সাক্ষীদের মিথ্যা বলা এবং অর্থ দাবির সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে পুলিশ সুপার বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।