নরসুন্দরের (নাপিত) দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে ভালো লাগত না। সেই বিরক্তি থেকেই একদিন জেদ করে হাতে তুলে নিয়েছিলেন কাঁচি ও চিরুনি। প্রথমবার ছোট ভাইয়ের চুল কাটতে গিয়ে অবশ্য কাঁদিয়েছিলেন তাঁকে। সেই ব্যর্থতা থেকেই শিখেছিলেন চুল কাটার কৌশল।
এরপর কেটে গেছে প্রায় ১৭ বছর। আয়নার সামনে, কখনোবা আয়নায় না দেখেই নিজের চুল নিজেই কেটে চলেছেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার মুজাহিদুল ইসলাম।
ঘটনাটি ২০০৬ সালের দিকে। তখন হাফেজি মাদরাসার ছাত্র মুজাহিদুলের সাপ্তাহিক ছুটি ছিল শুধু শুক্রবার। সপ্তাহজুড়ে মাদরাসার নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে থাকার পর ওই এক দিনের ছুটিতে ছিল নানা পরিকল্পনা। কিন্তু চুল কাটাতে গিয়ে সেই ছুটির বড় একটি অংশ কেটে যেত চুল কাটার দোকানে অপেক্ষা করে।
চুল কাটানোর জন্য সিরিয়াল পেতে কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। এক শুক্রবার দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চুল কাটার সুযোগ পাননি মুজাহিদুল। পরের সপ্তাহে আবারও যান একই দোকানে। সেদিন তাঁর আগে আরও তিনজন অপেক্ষায় ছিলেন।
মুজাহিদুল বলেন, ‘ক্ষুধা লাগায় ভাবলাম, বাড়ি থেকে খেয়ে আসি। কিন্তু ফিরে এসে দেখি, আমার সিরিয়াল চলে গেছে। অনেক অনুরোধ করেও সেদিন নাপিতকে রাজি করাতে পারিনি। তখন আমার ভেতরে জেদ চেপে বসে। ভাবলাম, অন্যের কাছে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে নিজেই যদি শিখে ফেলি!’
সেদিন থেকেই নাপিতের চুল কাটার কৌশল খেয়াল করতে শুরু করেন তিনি। কীভাবে কাঁচি ধরেন, কীভাবে চিরুনি ব্যবহার করেন—সবকিছু মনোযোগ দিয়ে দেখতেন। পরে বাজার থেকে একটি কাঁচি ও চিরুনি কিনে বাড়িতে আয়নার সামনে শুরু করেন অনুশীলন।
তবে নিজের চুলে অনুশীলন করে খুব একটা সুবিধা হচ্ছিল না। দরকার হলো একজন ‘মডেল’। মাদরাসার এক ছোট ভাইকে বুঝিয়ে নিজের হাতে তাঁর চুল কাটার উদ্যোগ নেন মুজাহিদুল। কিন্তু ফল হলো উল্টো।
হাসতে হাসতে সেই দিনের কথা স্মরণ করে মুজাহিদুল বলেন, ‘চুল কাটার পর ছেলেটির অবস্থা এমন হয়েছিল যে আয়নায় নিজেকে দেখে কান্না শুরু করে দেয়। তাকে সান্ত্বনা দিতে শেষ পর্যন্ত দোকান থেকে কিছু খাবার কিনে দিই। এরপর একটি ব্লেড কিনে মাথা ন্যাড়া করে দিতে হয়।’
প্রথমবার ব্যর্থ হলেও থেমে যাননি মুজাহিদুল। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে মাদরাসার সহপাঠী ও ছোটদের চুল কাটতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে কাঁচি ও চিরুনির ব্যবহার আয়ত্তে চলে আসে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মাদরাসাটি বড় ছিল। শুক্রবার অনেক ছাত্রের চুল কেটে দিতাম। এভাবে বারবার করতে করতেই চুল কাটার কৌশলটা শিখে ফেলি।’
একদিন তাঁর চুল কাটার কাজ দেখে এক শিক্ষকও প্রশংসা করেন। শিক্ষক তাঁকে পরামর্শ দেন, এত সুন্দর করে চুল কাটতে পারলে এর বিনিময়ে কিছু টাকা নেওয়া যেতে পারে।
শুরু হয় নতুন অধ্যায়। প্রথমে তিন টাকা করে চুল কাটতেন মুজাহিদুল। সপ্তাহ শেষে সেই টাকা জমিয়ে বন্ধুদের নিয়ে নাস্তা করতেন। পরে চাহিদা বাড়লে তিন টাকা থেকে পাঁচ, এরপর সাত টাকা করে নিতেন।
একসময় তাঁর মনে হলো, অন্যের চুল কাটতে পারলে নিজের চুলের জন্যই বা অন্যের কাছে যেতে হবে কেন? এরপর নিজের চুল নিজে কাটার অনুশীলনে আরও মনোযোগী হন তিনি।
শুরুতে সব সময় ফল ভালো হতো না। তবে ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি হয়। কোন অংশে কতটা চুল কাটতে হবে, কোথায় কাঁচি চালাতে হবে—সবই আন্দাজে আয়ত্তে চলে আসে।
মুজাহিদুল বলেন, ‘প্রথম দিকে আয়নার সামনে অনেক চেষ্টা করেছি। পরে অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন খুব দ্রুত নিজের চুল কাটতে পারি। অনেক সময় আয়নায় খুব বেশি না দেখেও প্রায় নিখুঁতভাবে চুল কেটে ফেলতে পারি।’
গত ১৭ বছরে এই অভ্যাস আর বদলায়নি। চুল বড় হলেই আয়না, কাঁচি ও চিরুনি নিয়ে বসে পড়েন তিনি। নেই কোনো সিরিয়াল, অপেক্ষা কিংবা সময়ের অপচয়।
মুজাহিদুলের ভাষায়, ‘এতে সময় বাঁচে। নিজের প্রয়োজনের জন্য অন্য কারও ওপর নির্ভর করতে হয় না। নিজের কাজ নিজেই করি।’
ফুলবাড়ীর স্থানীয় মানিক, রেজা, রাতুল, ফরহাদ, সঞ্জিত, সোহাগ ও জয় জানান, ছুটিতে বাড়িতে এলে মুজাহিদুল তাঁদের সেলুনের মতো চেয়ারে বসিয়ে চুল কেটে দেন। তাঁদের দাবি, তিনি নাপিতের মতোই সুন্দর করে চুল কাটতে পারেন।
মুজাহিদুল ইসলামের ছোট ভাই ও গণমাধ্যমকর্মী মোকাররম হোসেন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার ভাই মেধাবী এবং নানা ধরনের প্রতিভার অধিকারী। ভাই যখন মাদরাসা থেকে ছুটিতে বাড়িতে আসতেন, তখন আমাদের চুল কেটে দিতেন। পরে একসময় দেখি, তিনি নিজের চুলও নিজেই কাটছেন। প্রথম দিকে বিষয়টি আমাদের কাছে বেশ আশ্চর্যের ছিল। এখন মনে হয়, মানুষ ইচ্ছা ও অভ্যাসের মাধ্যমে অনেক কিছুই শিখে নিতে পারে।’
মুজাহিদুল ইসলাম ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের দক্ষিণ বাসুদেবপুর (পুরাতন বন্দর) গ্রামের বাসিন্দা। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় দাওয়া সম্পাদক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি তিনি। বর্তমানে পাশের পার্বতীপুর উপজেলার ভবানীপুর ইসলামিয়া কামিল মাদরাসায় প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। তিনি এক সন্তানের জনক।
নাপিতের দোকানে এক দিনের অপেক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া এক কিশোরের জেদ আজ ১৭ বছরের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রথম পরীক্ষার ব্যর্থতা, ছোট ভাইয়ের কান্না, মাদরাসার শিক্ষার্থীদের চুল কাটা, বন্ধুদের নিয়ে নাস্তা—সবকিছুর মধ্য দিয়ে নিজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন মুজাহিদুল।