বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় গুলিতে স্বামী ইসমাইলের মাথার খুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে মগজ বেরিয়ে গিয়েছিল। স্বামীর সারা শরীর ছিল রক্তাক্ত। ব্যান্ডেজ না করে তাঁর দেহ নড়াচড়া করা যাচ্ছিল না। লাশ অ্যাম্বুলেন্সে করে গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার পথে পুলিশ-বিজিবি হেনস্তা করে। যার কারণে দুর্ঘটনায় স্বামী মারা গেছে বললে অ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দেয়।
আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দিতে এ কথা বলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় গুলিতে মারা যাওয়া রিকশাচালক ইসমাইলের স্ত্রী লাকি বেগম। রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ চারজনের বিরুদ্ধে ১৬তম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন তিনি।
এই মামলায় বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম মুন গ্রেপ্তার থাকলেও পলাতক রয়েছেন পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান। অভিযোগ গঠনের পর চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্যের পর শুরু হয় সাক্ষ্য গ্রহণ।
জবানবন্দিতে লাকি বেগম জানান, তাঁর স্বামী ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে রিকশা চালানোর জন্য বাসা থেকে বের হন। মাগরিবের নামাজের সময় তাঁর ছেলের বন্ধু এসে বলে, ইসমাইল ডেল্টা কেয়ার হাসপাতালের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। সংবাদটি শোনার পর তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। চেতন ফিরলে দেখতে পান, একজন প্রতিবেশী ভ্যানে করে তাঁর স্বামীর মরদেহ বাসায় নিয়ে এসেছেন। তখন স্বামীর মাথার খুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে ও মগজ বের হয়ে গেছে। মাথায় গুলি লেগেছিল এবং সমস্ত শরীর রক্তাক্ত ছিল। তখন তাঁর মাথা ব্যান্ডেজ করার জন্য বেটার লাইফ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কারণ, ব্যান্ডেজ না করে তাঁকে নড়াচড়া করা যাচ্ছিল না।
লাকি আরও জানান, বেটার লাইফ হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় স্বামীর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তখন তাঁর দেবর বাড়ি থেকে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে বেটার লাইফ হাসপাতালে আসেন। এরপর তিনি, তাঁর ছেলেসহ নিকটাত্মীয়রা মরদেহ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। তবে যাওয়ার পথে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা তাঁদের নানাভাবে হেনস্তা করেন। তাঁরা অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখেন। তখন তিনি মিথ্যা কথা বলেন যে, স্বামী দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
লাকি বেগম জানান, পরে ফেসবুক, ইউটিউব ও খবর থেকে জানতে পারেন—পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে তাঁর স্বামী নিহত হয়েছেন। রাফাত, রেদোয়ান, রাশেদুল ও মশিউর হচ্ছেন ওই পুলিশ ও বিজিবি সদস্য; যাঁদের গুলিতে তাঁর স্বামী নিহত হয়েছেন। সাক্ষ্য দেওয়ার একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। চান স্বামীর হত্যার বিচার।