ইউরোপে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জনপ্রতি ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা নিত একটি মানব পাচারকারী চক্র। পরে ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন দেশ ঘুরিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে নারী-পুরুষদের পাচার করত চক্রটি। এ চক্রের অন্যতম হোতা মোহাম্মদ আরজু রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-৪ ও এসআরবি-১-এর যৌথ দল।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৪ অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান।
মো. হাফিজুর রহমান বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে আরজু রহমানকে ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বনানী সি ব্লক এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসআরবি আগে র্যাব নামে পরিচিত ছিল।
এসআরবি জানায়, গত ১৬ জুলাই মানবপাচার চক্রের প্রতারণার শিকার কামরুন নাহার নামের এক নারী এনএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তদন্তে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে আকর্ষণীয় বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কামরুন নাহার, ফাতেমা, আঞ্জুমান আরা, পারভেজ, ফিরোজ ও মেহেদী হাসানসহ একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, তিনজন ভুক্তভোগী কৌশলে দেশে ফিরতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যরা বিভিন্ন দেশে আটকা পড়েছেন। কামরুন নাহারকে মিশরে এবং আঞ্জুমান আরাকে শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
আরজু রহমান গ্রেপ্তারের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৩০ থেকে ৩৫ জন ভুক্তভোগী এসআরবির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে আরও প্রায় ৩০০ ভুক্তভোগীর যোগাযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ঘটনা, মামলা ও অভিযোগ পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এই চক্রের মাধ্যমে দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশি প্রতারণা ও মানব পাচারের শিকার হয়েছেন।
এসআরবির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরজু রহমান প্রায় ১২ বছর ধরে অবৈধভাবে বিদেশে লোক পাঠানো ও মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ‘আরজু ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ ও ‘নাফিস এয়ার ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ ব্যবহার করে তিনি এ কার্যক্রম চালাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসআরবি জানায়, আরজুর একটি ব্যাংক হিসাবের গত এক বছরের বিবরণীতে ১ কোটি ৭০ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
এসআরবির ভাষ্য, চক্রটি বেকার যুবক ও প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখাত। পরে ভুয়া ভিসা ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে নারীদের বিদেশে পাচার করে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে রাজি না হলে তাঁদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং জিম্মি করে রাখার অভিযোগও পেয়েছে এসআরবি। কোনো কোনো নারীকে সিগারেট দিয়ে শরীরে জখম করার অভিযোগও রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এসআরবি জানায়, মিশরে অবস্থানরত কয়েকজন নারী পালিয়ে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে পরিবারের কাছে নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন। কয়েকজন নারী এখনো সেখানে আটক রয়েছেন। তাঁদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম চলছে।
এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের এ পর্যন্ত র্যাব ও এসআরবির অভিযানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ২২৩ জন মানব পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরজু রহমানকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁর সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত চলছে।