ট্রেনের টিকিট অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছাড়ার কিছু সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। এ কারণে যাত্রার ১০ দিন আগে টিকিট ছাড়ার সময়ে অনলাইনে প্রবেশ করলেও টিকিট পাওয়া যায় না। টিকিট উধাওয়ের বিষয়টি নিয়ে গত ২২ সেপ্টেম্বর স্বপ্রণোদিত হয়ে সিলেটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আমলি-১১ মামলা করেছেন। মামলা তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) ১ অক্টোবর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছেন পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক আবদুল আহাদ।
টিকিট উধাওয়ের বিষয়টি নিয়ে আজ বুধবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার আশফাক নিপুন। স্ট্যাটাসে তিনি উল্লেখ করেছেন, সেজো মামা, মামী আর মামাতো বোন এই পূজার ছুটিতে কক্সবাজার ঘুরে আসতে চান। যেহেতু লং জার্নিতে বয়স এবং স্বাস্থ্যের কারণে মামার পক্ষে টানা ১০/১২ ঘণ্টা শুধুমাত্র চেয়ারে/সিটে একটানা বসে যাওয়া সম্ভব না কারণ উনার হাঁটাহাঁটি করতে হয়, শুতে হয়, তাই বাস ভ্রমণের চিন্তা বাদ দিয়ে তাঁরা আমাকে অনুরোধ করলেন যাত্রার ১০ দিন আগে সকাল ৮ টায় যখন 'ঢাকা টু কক্সবাজার' ট্রেনের টিকিট ছাড়া হবে, আমি যেন অনলাইনে সঙ্গে সঙ্গে ৩টা টিকিট কিনে ফেলি।
সেই মোতাবেক আজকে সকাল ৭.৪৫ মিনিট থেকে আমি মোবাইল নিয়ে বসলাম। ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা করতে করতে আমার মুখস্থ লম্বা ছুটিতে কি পরিমাণ চাপ পড়ে ট্রেনের টিকিট কেনায়। আমি কোন রিস্ক নিতে চাই না। মোবাইলে অন্য সব নোটিফিকেশন অফ করা কারণ ৮টা বাজতেই টিকিট কাটতে গিয়ে তাড়াহুড়ায় আমি অন্য কোনো নোটিফিকেশন ভুলে চাপ দিয়ে 'কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা' করতে চাই না।
৭.৫৯। নড়েচড়ে বসি। লগ আউট করে আবার লগ ইন করি। যেন টিকিট কাটার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে লগ আউট না হয়ে যাই। যারা অনলাইনে টিকিট করেন নিয়মিত, তারা এই ব্যাপারটা জানেন। প্রতিটা সেকেন্ড অমূল্য। সেকেন্ড তো দূর, প্রতি মিলি-সেকেণ্ডও এখন অমূল্য। ৮.০০ টা বাজলো। সঙ্গে সঙ্গে চাপ দিলাম 'সার্চ ট্রেন' এ।
আলাদিনের জাদুর চেরাগ ঘষতেই যেন গুহার দরজা খুলে যাওয়ার মত ট্রেনের সিট প্ল্যান খুলে গেল চোখের সামনে! সারি সারি সিট। আমার দিকে তাকিয়ে বলছে 'বেছে নাও, বেছে নাও!" এখন শুধু টেপার পালা। বিসমিল্লাহ বলে শুরু করলাম।
৮.০১। সব টিকিট শেষ! গোটা দুইটা ট্রেনের সব টিকিট ১ মিনিটে শেষ, একদম সব! আমি নিয়মিত ট্রেন ভ্রমণ করি এবং অনলাইনে টিকিট কাটি দেখে একবার ঘড়ি ধরে হিসাব করছিলাম একটা টিকিট সিলেক্টের পরে কনফার্ম করে, এসএমএসে আসা ওটিপি টাইপ করার পরে, বিকাশ/কার্ড নম্বর দিয়ে, সেটার ইনফরমেশন নম্বর এসএমএস থেকে টাইপ করার পরে, বিকাশ/কার্ড পাসওয়ার্ড দিয়ে টিকিট রিকনফার্ম করে পেতে পেতে মিনিমাম সাড়ে ছয় থেকে সাত মিনিটের মত লাগে। তার মানে ঠিক ৮টায় একদম সবাই যদি কাঙ্ক্ষিত সিট একযোগে রেকর্ড টাইমে ক্লিক করে প্রসেস শুরু করতে পারে, সবার ইন্টারনেট কানেকশন ওই সময় যদি হাইস্পিডে থাকে, তাহলেও সব টিকিট একসঙ্গে অনলাইনে পেতে পেতে মিনিমাম ৮.০৭ মিনিট হওয়ার কথা? যা প্রায় অসম্ভব! আর এখানে ৮টায় শুরু করে ৮.০১ মিনিটে আস্ত দুইটা ট্রেনের টিকিট শেষ! এটা কীভাবে সম্ভব?
খুবই সম্ভব! কারণ এটা বাংলাদেশ। জুলভার্ণ লিখেছিলেন সায়েন্স ফিকশন '৮০ দিনে বিশ্ব ভ্রমণ'। আর আমাদের রেলওয়ে লিখল 'এক টিকেটে দুই ছবি'র মত 'এক মিনিটে দুই ট্রেন গায়েব' এর মত কমার্স ফিকশন!
বাই দ্যা ওয়ে, আমি এতটাও সরল না যে ঈদে, পূজার লম্বা ছুটিতে যখন চাই তখনই যেন টিকিট পাই আবদার করে বসব। বাস্তবতা আমিও জানি। তাই পরিবারসহ ঈদ, পূজা, দীর্ঘ ছুটির যাত্রা হলে এরকম সময়ে ঠিক ৮টা বাজার আগে থেকেই বসে থাকি। এবং কখনোই টিকিট পাই না। হাসিনার আমলেও না, এই আমলেও না। কারণ কি?
কারণ, টিকিট সিন্ডিকেট। বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকিট সিন্ডিকেট বলে যে গ্রুপটা আছে এদের নাম গিনিজ বুকে ওঠানো এখন হাই টাইম। কারণ ১ মিনিটে গোটা দুই ট্রেনের সব টিকিট বিক্রি হওয়ার রেকর্ড পৃথিবীতেই অসম্ভব! আপনি যতই পাওয়ারফুল হোন, যতই জনগণের সরকার হোন আর স্বৈরাচারী হোন, এদের কাছে কোন সরকারের দুই পয়সার দাম নাই। মহাপরাক্রমশালী সব সরকারকে সব সময়, সব আমলে এরা প্যান্টের পেছনের পকেটে টিস্যু পেপার বানিয়ে ঘোরে। আপনি এই সিন্ডিকেট ভাঙতে পারবেন না। আপনার মন্ত্রণালয় পালটে যাবে, আপনাকে বদলি করে অন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, মন্ত্রী থেকে এমপি বানিয়ে দেয়া হবে কিন্তু এদের পশমও আপনি স্পর্শ করতে পারবেন না, টিকিট তো দূর কি বাত।
বর্তমান রেলমন্ত্রী তো উনাদের কাছে শিশু। কারণ উনার বয়স এখনো ৭ মাস হয় নাই। এরা এখানে জেঁকে বসে আছে বহু বছর ধরে। আপনি সফটওয়্যার পাল্টাবেন, এরা আপনার হার্ডওয়্যার পালটায় দিবে। আপনি শিফট পাল্টাবেন, এরা আপনাকে শিফট-ডিলিট করে দিবে। এদের এতই ক্ষমতা! ১ মিনিটে দুই ট্রেনের সব টিকিট শেষ! ভাবা যায়?
সফল সরকারের সূচক ক্রমশই ছোট হয়ে আসছে আমার কাছে । কোনো সরকার যদি শুধুমাত্র রেলওয়ে এবং বিমান বন্দরের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে পারেন, মাথা নুইয়ে, করজোরে তাদের সর্বকালের সেরা সরকার বলে মেনে নিব। শুধু মেনেই নিব না, সেই সরকার আমাকে দিয়ে যা করাতে চান, তাই করব। বিনাবাক্যব্যায়ে। পারবেন? হ্যায় হিম্মাত?