রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনে প্রাইভেট কারের চাপায় নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীম নিহতের ঘটনায় তাঁর বাবা ও সৎ ভাই মিলে গাড়ির মালিকপক্ষের সঙ্গে ৯ লাখ টাকায় আপস-মীমাংসা করেছেন। মামলার বাদী ও নিহতের সৎ ভাই মো. মোক্তাদীর ইসলাম ওই টাকা গ্রহণ করে মামলাটি প্রত্যাহার এবং আসামিদের জামিনে আপত্তি না জানানোর অঙ্গীকার করেছেন। আপসনামায় নিহতের বাবা এরশাদুল হক ও মামা খায়রুল ইসলাম সাক্ষী হিসেবে সই করেছেন। তবে নিহতের চাচা, চাচাতো ভাই, ফুফাতো ভাই ও বোনজামাইসহ স্বজনদের একটি পক্ষ এতে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, টাকা দিয়ে রফাদফা নয়, দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের সঠিক বিচার করতে হবে।
গত মঙ্গলবার বিকেলে বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীম (২৪)। এ সময় দ্রুতগতির একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে তাঁকে চাপা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় পরে তাঁর মৃত্যু হয়। মেহেদী নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় গ্রামের হাজীপাড়ার এরশাদুল হকের ছেলে।
এ ঘটনায় মেহেদীর বড় ভাই মো. মোক্তাদীর ইসলাম বাদী হয়ে গত ২৩ সেপ্টেম্বর গুলশান থানায় সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করেন। এজাহারে বলা হয়, বেপরোয়া গতিতে প্রাইভেট কার চালিয়ে মেহেদীকে চাপা দেওয়া হলে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান। এজাহারে গাড়িচালক হিসেবে আকাশ মারক (৪৪) নামের একজনকে আসামি করা হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৭ বছর বয়সী আযান আলী শরীফকে ওই মামলায় আইনের সংস্পর্শে আনা হয়।
গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইসমাইল হোসেন বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সড়ক পরিবহন আইনের মামলায় তদন্তে কিশোরের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।’
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার আযানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে তাকে ঢাকার শিশু আদালত-৮-এ হাজির করা হলে শুনানি শেষে আদালতের বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদির তাকে সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। শুনানিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আরেফিন ইসলাম কিশোরকে সংশোধনাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। অন্যদিকে তার আইনজীবী মো. আলমগীর হোসেন জামিনের আবেদন করেন।
আযানের জামিন আবেদনে বলা হয়, দুর্ঘটনার সময় কিশোরটি গাড়ির চালকের পাশের আসনে বসা ছিল। নিহত মেহেদী শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী ছিলেন। হর্ন বাজানোর পরও তিনি দ্রুত সরে যেতে না পারায় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটে। আবেদনে আরও বলা হয়, দুর্ঘটনার পর কিশোরের পরিবারের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে ৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মেহেদীর দাফন-কাফন ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ১ লাখ টাকা এবং তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় আরও ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়। টাকা এরই মধ্যে নিহতের পরিবারকে দেওয়া হয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। আপসনামায় আসামিরা জামিনে মুক্তি পেলে বা খালাস পেলে নিহতের পরিবারের কোনো আপত্তি থাকবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে বলেন, মামলাটি তদন্তকালে ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দুর্ঘটনার পরপরই প্রাইভেট কারের ডান পাশের চালকের দরজা খুলে আযান আলী শরীফ বের হয়ে আসেন। তদন্তে ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক সত্যতাও পাওয়া যাচ্ছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে আটক রাখার আবেদন করা হয়। পরে শুনানি শেষে কিশোরের আইনজীবীর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে আদালত তাকে সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ফুটপাতে বসে মেহেদী বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এ সময় দ্রুতগতির প্রাইভেট কারটি তাঁকে চাপা দেওয়ার পর গাড়ি থেকে দুজন ব্যক্তি বের হয়ে আসেন। গাড়ির ডান পাশ অর্থাৎ চালকের আসন থেকে কালো টি-শার্ট পরা এক কিশোরকে বের হতে দেখা যায়। অপর পাশ থেকে শার্ট পরা মধ্যবয়সী একজন ব্যক্তিও বের হয়ে আসেন। আশপাশের লোকজন ছুটে এলে তারা দুজনই গাড়ির পাশে যান। পরে ওই কিশোরকে সেখান থেকে এক দিকে সরে যেতে দেখা যায়।
এরই মধ্যে নিহতের পরিবারের এক পক্ষের সঙ্গে গাড়ির মালিকপক্ষের ৯ লাখ টাকার আপসের নথি সামনে এসেছে। আপসনামায় নিহতের পক্ষে তাঁর বাবা এরশাদুল হক ও মামলার বাদী সৎ ভাই মো. মোক্তাদীর ইসলাম এবং অপরপক্ষে আযান আলী শরীফের আপন বড় ভাই আয়াজ আলী শরীফ (২৮) সই করেছেন।
আপসনামায় বলা হয়েছে, বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনে প্রাইভেট কারের চাপায় মেহেদী হাসান মীম নিহতের ঘটনায় নিহতের পরিবারের সঙ্গে গাড়ির মালিকপক্ষের ৯ লাখ টাকায় আপস হয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং আসামিদের জামিনে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে অনাপত্তি জানানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, প্রাইভেট কারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের ফুটপাতে উঠে গেলে সেখানে বসে থাকা মেহেদী গুরুতর আহত হন। পরে তিনি মারা যান। দুর্ঘটনার সময় গাড়িটি চালাচ্ছিলেন আকাশ মারক। গাড়িতে আয়াজ আলী শরীফের ছোট ভাই আযান আলী শরীফও ছিলেন। এ ঘটনায় মেহেদীর ভাই মো. মোক্তাদীর ইসলাম গুলশান থানায় মামলা করেন।
আপসনামায় আরও বলা হয়, দুর্ঘটনার পর গাড়ির চালক ও আযানের ভাইও আহত হন এবং গাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে নিহত মেহেদীর পরিবারের পাশে দাঁড়াতে গাড়ির মালিকপক্ষ উদ্যোগ নেয়। মেহেদীর দাফন-কাফনসহ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য প্রথমে ১ লাখ টাকা এবং তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় আরও ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে নিহতের ভাই মো. মোক্তাদীর ইসলাম গাড়ির মালিকপক্ষের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা গ্রহণ করেছেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মামলাটি প্রত্যাহারের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং আযান আলী শরীফ ও গাড়িচালক আকাশ মারকের জামিনে অনাপত্তি জানাতে আদালতে উপস্থিত থাকার অঙ্গীকার করেছেন মোক্তাদীর। মামলা প্রত্যাহারের যাবতীয় ব্যয় গাড়ির মালিকপক্ষ বহন করবে বলেও আপসনামায় উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি মেরামত কিংবা আহত চালক ও আযানের ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য নিহতের পরিবারের কাছে কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করা হবে না বলে গাড়ির মালিকপক্ষ অঙ্গীকার করেছে। ভবিষ্যতে দুর্ঘটনাটি নিয়ে আর কোনো অভিযোগ বা আপত্তি না তোলার কথাও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে নিহতের স্বজনদের একটি পক্ষের অভিযোগ, একটি চক্র কৌশলে মামলার প্রকৃত আসামিকে আড়াল করে ৯ লাখ টাকায় বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করছে। এ নিয়ে তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
নিহত মীমের বোনজামাই মুফতি মোহাম্মদ মুজিবুল ইসলাম বলেন, ‘গুলশান থানার এই দূরভিসন্ধির কথা আমরা পরে ভিডিও দেখে জেনেছি।’ তিনি জানান, নিহত মেহেদীর দাফন শেষে মামলার বাদী তাঁর সৎ ভাই মোক্তাদীর ইসলাম এবং শ্বশুর এরশাদুল হক ঢাকায় চলে যান।
নিহতের চাচা রাকিবুল ইসলাম রকি বলেন, মামলার বাদী মোক্তাদীর নিহতের সৎ ভাই। তিনি মেহেদী বা তাঁর বাবা-মায়ের ভরণপোষণ দিতেন না। বাক্প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও মেহেদীই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন।
নিহতের চাচাতো ভাই আল আমিন বলেন, অনেক কষ্ট করে সংসার চালাতেন মেহেদী। বাক্প্রতিবন্ধী হওয়ায় তিনি ইশারায় কথা বলতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি নির্মাণশ্রমিকের কাজ করে পরিবারের হাল ধরেছিলেন। অবসর সময়ে কাগজের ফুল তৈরি করে গ্রামীণ মেলা ও বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করতেন তিনি। আল আমিন বলেন, ‘আমরা টাকার বিনিময়ে রফাদফা চাই না। প্রকৃত দোষীর শাস্তি চাই।’
নিহতের ফুফাতো ভাই সাজ্জাদ চৌধুরী জয় বলেন, ‘টাকা নয়, আমরা সঠিক বিচারটা চাই।’
এ বিষয়ে আপসনামায় উল্লেখিত মুঠোফোন নম্বরে মামলার বাদী ও নিহতের সৎ ভাই মো. মোক্তাদীর ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে নিহত মেহেদীর বাবা ও আপসনামায় সাক্ষী হিসেবে সই করা এরশাদুল হকের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে অপর প্রান্ত থেকে এক নারীকণ্ঠ জানান, তিনি বাড়িতে নেই।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আযান গুলশান এলাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা আব্বাস আলী শরীফ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ক্যাপ্টেন। গাড়িটির মালিক তাঁর মা সিগমা আব্বাস। পুলিশের তথ্য ও গাড়ির নথিপত্র অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় গাড়িটির ভেতরে আযান ও আকাশ মারক ছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার আসামি আকাশ মারক বর্তমানে পলাতক। তাঁকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।